আল মাহমুদ : সনেটে অনন্য

Aug 17, 2019 04:30 pm
আল মাহমুদ

 

সনেট মূলত গীতি কবিতারই একটি ধ্রুপদী শিল্পরূপ। কবির একটি মাত্র ভাবকল্পনা একটি ধ্রুপদী নিয়মকে অবলম্বন করে সনেটে রূপায়িত হয়। সনেট এক প্রকার মন্ময় কবিতা। ধ্রুপদী নিয়ম মেনে চলতে হয় বলে সনেট স্বাধীন গীতিকবিতা থেকে স্বতন্ত্র। ‘সনেট’ শব্দটি ইটালিয়ান ‘সনেটো’ (মৃদু ধ্বনি) শব্দ থেকে উদ্ভূত। ইটালিয়ান কবি Petrarch (১৩০৪-৭৪) কবিতার এ প্রকরণের জন্মদাতা। ইটালিয়ান কবি পেত্রার্ক, দান্তে, ট্যাসো প্রমুখেরা কবিতার ইতিহাসে সনেটকে জনপ্রিয় করে তোলেন। পরবর্তীতে ইংরেজি সাহিত্যে সনেটের চর্চা হয়। ষোড়শ শতাব্দীতে Wyatt এবং Surrey সর্বপ্রথম ইংরেজি সনেট লিখেন। ইংরেজি সাহিত্যে সিডনি, শেকসপিয়র, মিলটন, ওয়ার্ডসওয়ার্থ, কিটস, ব্রাউনিং প্রমুখ বিখ্যাত কবিরা সনেট চর্চা করেন। বিশ্বসাহিত্যে সনেটের দু’টি ধারা সৃষ্টি হয় : এক. ইটালিয়ান সনেট, দুই. ইংরেজি সনেট বা শেকসপিরিয়ান সনেট।
আধুনিক বাংলা কাব্যের জনক কবিগুরু মাইকেল মধুসূদন দত্ত সর্বপ্রথম বিদেশী সাহিত্যের সনেট প্রকরণটি বাংলায় আমদানি করেন। তিনি সনেটের জন্মদাতা পেত্রার্কের এবং শেকসপিয়র উভয়ের প্রকরণ ধারণ করেছিলেন। ১৪ অক্ষর সমন্বিত, ১৪ পঙ্ক্তিতে সমাপ্ত, অষ্টক ও ষষ্টকের পর্ব ভাগের নিয়ম ধারণ করে পঙ্ক্তিগুলোর মেলবন্ধনের রীতি রক্ষা করে মধুসূদন দত্ত সনেটকে বাংলা ভাষায় জনপ্রিয় করে তোলেন। ‘বঙ্গভাষা’, ‘কপোতাক্ষ নদ’, ‘সায়ংকালের তারা’ ইত্যাদি সনেটে কবিগুরু মধুসূদনের কবিকল্পনা অখণ্ড ভাবমূর্তিতে প্রকাশ পেয়েছে।

সনেট বাংলা ভাষায় ‘চতুদর্শপদী কবিতা’ হিসেবে জনপ্রিয়তা অর্জন করে। মধুসূদনই ‘বাংলা চতুর্দশপদী’ কবিতার পথিকৃৎ। সনেটের সনাতন রীতি সম্পূর্ণ না মানলেও মধুসূদনের সনেট সার্থকতা অর্জন করেছে। পরবর্তী কালে দেবেন্দ্রনাথ সেন, অক্ষয়কুমার বড়াল, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মোহিত লাল মজুমদার, প্রমথ চৌধুরী বাংলা সনেট তথা চতুর্দশপদী কবিতার চর্চা করেন। ভাবের দিক থেকে দেবেন্দ্রনাথের সনেট সংহত। অক্ষয় কুমারের সনেটের ভাব ও ভাষা প্রশংসনীয়। এরপর রবীন্দ্রনাথ সনেটকে নিরেট চৌদ্দ পঙ্ক্তির গীতি কবিতায় রূপান্তর করে ফেলেন। এতে একটি অখণ্ড ভাবের প্রকাশ থাকলেও আঙ্গিক দিক দিয়ে চতুর্দশপদী কবিতা মাত্র। প্রমথ চৌধুরীর ‘সনেট পঞ্চাশৎ’ লঘু চতুর্দশপদী কবিতা হিসেবে উল্লেখযোগ্য। মোহিত লাল মজুমদার ‘বঙ্কিমচন্দ্র’ শিরোনামে একটি উৎকৃষ্ট সনেটগুচ্ছ রচনা করেছেন। তিরিশোত্তর আধুনিক কবিদের মধ্যে জীবনানন্দ দাশও সনেট রচনা করেছেন। বাংলা সনেট ১৪ পঙ্ক্তির মধ্যে সীমিত থাকলেও অক্ষর মাত্রায় ১৮ মাত্রা পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়। জীবনানন্দ দাশ সনেটের ১৪ ও ১৮ মাত্রার অক্ষর বিন্যাসকে ২২ থেকে ২৮ মাত্রা পর্যন্ত সম্প্রসারিত করেন।

শিল্পীর স্বাধীনতা বলতে একটা কথা আছে। কোনো শিল্পীই নিয়মের ব্যাকরণে আবদ্ধ থাকতে চান না। প্রতিভার ধর্ম নতুনত্বের দিকেই। শুধু নতুনত্ব দিয়ে শিল্পের বিচার হয় না। শিল্প ‘সহৃদয় হৃদয় সংবেদী’ পাঠকের অন্তরে কতটুকু স্থায়িত্ব লাভ করে সেটাই বিচার্য বিষয়। এ দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে এক জনের নাম বাংলা সনেটের ইতিহাসে উঠে আসে-তিনি আল মাহমুদ। সমসাময়িক কালে শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী, সৈয়দ শামসুল হকসহ অনেকেই সনেট বা চতুর্দশপদী কবিতা লিখেছেন। পরবর্তীতেও চতুদর্শপদী কবিতা রচনার ধারা অব্যাহত রয়েছে। কবি আল মাহমুদ তাঁর তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘সোনালী কাবিন’ কাব্যগ্রন্থে ‘সোনালী কাবিন’ শীর্ষক চৌদ্দটি সনেট রচনা করে সমগ্র বাংলা সাহিত্যে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। ‘সোনালী কাবিন’ প্রকাশিত হবার পর উভয় বাংলায় তথা বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি হিসেবে আল মাহমুদের আত্মপ্রকাশ ঘটে। অনেকেই দম্ভ করে কোমর বেঁধে নেমে ছিলেন-সোনালী কাবিনের সনেটগুচ্ছকে অতিক্রম করতে। কিন্তু আজো পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের কোনো কবির পক্ষে সোনালী কাবিনকে অতিক্রম করা সম্ভব হয়নি। জীবনানন্দের ভাষায় বলা যায়-‘এ পৃথিবী একবার পায় তারে/পায় না কো আর’। কবির জীবদ্দশাতে সোনালী কাবিনের ৪০ বছর পার হয়েছে। চল্লিশ বছরের মধ্যে আমরা তার মতো আর কোনো সনেট রচয়িতার সাক্ষাৎ পেলাম না। ভাবে, ভাষায়, ঐতিহ্যের লালনে, শিল্পগুণ বিচারে সোনালী কাবিন যেমন অপূর্ব তেমন অনন্য হয়েই থাকল। ওই চৌদ্দটি সনেট কবি চট্টগ্রামে বসেই লিখেছেন। যে জন্য চট্টগ্রামের সহৃদয় পাঠক গর্ববোধ করেন।

কবি আল মাহমুদ ‘সোনালী কাবিনের’ চৌদ্দটি সনেট ছাড়াও ‘বখতিয়ারের ঘোড়ায়’ চারটি, ‘মিথ্যাবাদী রাখাল’ এ একটি, ‘আমি দূরগামী’র ‘চতুর্দশপদী’, ‘দোয়েল ও দয়িতার ‘খরা’ সনেটগুচ্ছের ছয়টি, উড়াল কাব্যের ‘চতুর্দশপদী’, ‘দ্বিতীয় ভাঙনে’ ‘খনার বর্ণনা-সনেট পঞ্চক’ ইত্যাদি সনেটগুচ্ছ রচনা করেছেন। সোনালী কাবিনের পর আরো ১৮টিসহ সর্বমোট ৩২টি সনেট আমাদের পাঠের সুযোগ হয়েছে। আমরা লক্ষ করেছি বাংলা সনেটের প্রকরণগত এবং ভাবগত বিচারে সনেটগুলোতে ভাবের ঐক্য, মেলবন্ধন এবং রূপকল্পের কোথাও শৈথিল্য নেই।

আল মাহমুদ মাটির সোঁদাগন্ধ ছড়ানো কবি। লোক-লোকান্তরে ভ্রাম্যমাণ কৌম সমাজের আধুনিক বাসিন্দা। শিল্পের নন্দিত যাত্রায় উজ্জ্বল মশালবাহী কৃতী ক্রীড়াবিদ। এ উপমহাদেশের রাজনৈতিক উত্থান-পতনের ইতিহাসে নানা ফোঁড় ফোঁড়ন খেয়ে বাংলা কাব্যে অর্ধ শতাব্দীরও অধিক সময় আলোচনা সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ-তিনি সাহিত্যের মূলধারা থেকে বিচ্যুত। নাস্তিক থেকে আস্তিকে পরিবর্তিত। তথাকথিত সেকুলার না থেকে হয়েছেন ধার্মিক। বাংলা সাহিত্য ও বাংলা কাব্যের মূলধারা কি? বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস ঐতিহ্য আমাদের যতটুকু জানা আছে তাতে দৃষ্টি দিলে দেখতে পাই-বাংলা কাব্যে মূলধারার যাত্রা বিশ্বাস কেন্দ্রিক, ধর্ম কেন্দ্রিক। সেখানে সেকুলারিজমের কোনো স্থান খুঁজে পাওয়া যায় না। ‘চর্যাপদ’ বৌদ্ধধর্মের তত্ত্বকেন্দ্রিক কবিতা। ‘বৈষ্ণবপদাবলী’ চৈতন্যধর্ম ও সনাতন ধর্মকেন্দ্রিক। ‘মঙ্গলকাব্য’গুলো লৌকিক দেবদেবীর প্রতি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস ও আস্তিকতায় ভরা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে ধর্মনিরপেক্ষ সাহিত্যের দারা প্রতিষ্ঠা পায়। আল মাহমুদ সে ধারার কবি। শেষ পর্যন্ত আল মাহমুদ বিশ্বাসের ধারাটাই ধারণ করেন। ধর্মনিরপেক্ষ সাহিত্য চর্চার ধারাটির সৃষ্টি উনবিংশ শতাব্দীতে।

রাজনৈতিকভাবে কিংবা ঘরনাকেন্দ্রিক সাহিত্য চর্চা সার্বজনীন হয় না। বিশ্বাসের জায়গা যার যেমনই হোক রচিত সাহিত্য যদি নন্দনতত্ত্বের বিচারে সফল হয় তার সাহিত্য দেশকাল পরিবেশকে ছাড়িয়ে সর্বকালে সর্বজনের হয়ে ওঠে। আল মাহমুদের সনেটের ভাব সার্বজনীন, শাশ্বত ও চিরন্তন। জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে সব নর-নারীর জৈবিক স্বভাব ও ধর্মকে শিল্পসম্মতভাবে ধারণ করেছে সোনালী কাবিনের সনেটগুচ্ছ। সোনালী কাবিনের অখণ্ড ভাব কল্পনা একান্ত কবির হলেও তার শিল্পরূপ ও আবেগের সার্বজনীনতা সকলকে ছুঁয়ে যায়। সনেট তো বাংলা সাহিত্যে মাইকেল মধুসূদন থেকে শুরু করে অনেকেই রচনা করেছেন। কবিদের একান্ত ব্যক্তিগত অনুভূতি কখনো কখনো কারো কারো কাছে ভালো লাগলেও তার ভাব আ’ম পাঠকের সার্বজনীন বিষয় হয়নি। শিল্পগুণ ও প্রকরণের কারণে হয়তো কবিতার পাঠকের কোনো কোনো সনেট অসাধারণ মনে হয়। অথচ সোনালী কাবিনের সনেটগুচ্ছ জৈবিক সত্যের শিল্পরূপ হওয়ায় সব পাঠকের কাছে সমান গুরুত্ববহ। সামগ্রিক বিচারে বাংলা সনেটে আল মাহমুদ যেভাবে পাঠক সমাজকে নাড়া দিয়েছেন সে বিচারে আমরা বলতে পারি, বাংলা সনেটে তিনি ভাবের দিক থেকে এক এবং অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্প কীর্তি নিয়েই দাঁড়িয়ে আছেন।
বাংলা সনেটের ধারায় সফল শিল্পীর মধ্যমণি আল মাহমুদ। জনপ্রিয়তায় তাঁকে এখনো কেউ অতিক্রম করতে পারেনি।

আল মাহমুদের ‘সোনালী কাবিনে’র সনেট বা চতুদর্শপদী কবিতা অক্ষরবৃত্ত ছন্দে রচিত। সনেটের মেল বন্ধনে ধ্রুপদী নিয়ম বর্তমান বলেই এদের আমরা সনেট বলছি। অন্যথায় এ সনেটগুচ্ছও অক্ষরবৃত্তের গীতি কবিতা। এখানে সনেটের সাথে নিটোল গীতি কবিতার বৈশিষ্ট্য একাকার হয়ে আছে। বাংলা সনেটের সার্থকতায় মাইকেল মধুসূদন দত্তের পর আল মাহমুদকেই ভাবের জনপ্রিয়তার জন্য শ্রেষ্ঠ শিল্পী বলতেই হয়।

বাংলা সনেটের মেলবন্ধনে আল মাহমুদ ইতালিয়ান সনেট ও শেকসপিরিয়ান সনেট উভয় রীতি অনুসরণ না করে নতুনত্বের পরিচয় দিয়েছেন। অক্ষরবৃত্ত ছন্দের আঠার মাত্রার পঙ্ক্তি রচনা করেছেন তিনি। মধুসূদনের মতো ১৪ মাত্রার সনেট সোনালী কাবিনে নেই। পর্ব ভাগ ৮+১০ কিংবা ১০+৮ মাত্রায় বিন্যস্ত। মেলবন্ধনে ক-খ, কখ, গক, গক, ঘচ, ঘচ, ছছ। আবার কখ, কখ, গঘ, গঘ, ঙচ, ঙচ, ঙচ, মেলবন্ধনও দিয়েছেন। তাই বলে সনেটের বৈশিষ্ট্য ও ভাবের সংহতি কোথাও বিঘ্নিত হয়নি।

নদীর সিকস্তি কোনো গ্রামাঞ্চলে মধ্যরাতে কেউ-ক
যেমন শুনতে পেলে অকস্মাৎ জলের জোয়ার-খ
হাতড়ে তালাশ করে সঙ্গিনীকে, আছে কিনা সেও-ক
সে নারী উন্মুক্ত করে তার ধন-ধান্যের দুয়ার-খ
অন্ধ আতঙ্কের রাতে ধরো ভদ্রে, আমার এ-হাত-গ
তোমার শরীরে যদি থেকে থাকে শস্যের সুবাস-ঘ
খোরাকির শত্রু আনে যত হিংস্র লোভের আঘাত-গ
আমরা ফিরাবো সেই খাদ্যলোভী রাহুর তরাস-ঘ
নদীর চরের প্রতি জলে খাওয়া ডাঙার কিষাণ-ঙ
যেমন প্রতিষ্ঠা করে বাজখাঁই অধিকার তার,-চ
তোমার মস্তকে তেমনি তুলে আছি ন্যায়ের নিশান-ঙ
দয়া ও দাবিতে দৃঢ় দীপ্তবর্ণ পতাকা আমার’-চ
ফাটানো বিদ্যুতে আজ দেখো চেয়ে কাঁপছে ঈশান-ঙ
ঝড়ের কসম খেয়ে, বলো নারী, বলো তুমি কার?-চ
(সোনালী কাবিন-১২)

বাংলা সনেটের আদর্শখ্যাত মধুসূদনের ‘বঙ্গভাষা’র মেলবন্ধন : কখ, কখ, খক, খক, গঘ, ঘগ, ঙঙ। আর তার ‘কপোতাক্ষ নদ’ এর মেলবন্ধন : কখ, কখ, কখ, খক, গঘ, গঘ, গঘ-এ মিলবন্ধন আল মাহমুদ অনুসরণ না করেও তাঁর সনেটগুচ্ছকে সার্থকতা দান করতে সক্ষম হয়েছেন।
সোনালী কাবিনে ব্যক্তি বাঙালি কবি, আবহমান মানুষ, ইতিহাসের মধ্যে হৃদয়ের ইতিহাস গেঁথে দিয়েছেন কবি। জনপদ, শস্য, হৃদয়-সবই ‘সোনালী কাবিনে’ এক মহাসত্যের বিভিন্ন দিক। আর তার শব্দ আবহমান, চিরকালীন গ্রামীণ এবং লোকজ। গ্রামীণ লোকজ শব্দকে তিনি ওজস্বী ও অভিজাত করে উভয় বাংলায় চমক দেখিয়েছেন। ফলে চৌদ্দটি সনেট বাংলা সাহিত্যে চিরন্তন কবিতা শিল্পের আসনে আসীন।