গল্পটা মা ও ছেলের

Aug 17, 2019 04:38 pm
গল্পটা মা ও ছেলের

 

মনিরা আক্তার চা, পান না খাইয়ে ছাড়ল না। সকালে, সূর্যটা কেবল তেতে উঠতে শুরু করেছে। আমি তখন পূর্বপাড়ার মল্লিকদের বাড়িতে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। এরই মধ্যে মনিরা আক্তার লোক মারফত আমাকে দেখা করার জন্য বলে পাঠালে ভেবেছিলাম, মনের দুঃখ শেয়ার করার জন্য ডেকেছে। যেমনটা মাঝে মধ্যে ডাকে। আর আমি এলে পুরনো দিনের গল্পের ঝাঁপি খুলে বসে, যার অনেকগুলো আমার নিজেরই দেখা, অনেকগুলো অনেকবার তার কাছেই শোনা। কিন্তু মনিরা আক্তারের বাসায় এসে আমি অনেকটুকু বিস্মিত হলাম। তার দীর্ঘ দিনের ঝিম ধরা বাড়ি হঠাৎ যেন জেগে উঠেছে। জমজমাট বাড়ির আবহাওয়া। একটু পর বুঝলাম মনিরা আক্তারের ছোট ছেলে আদিল এসেছে। শুনলাম সে এসে মসজিদের মোল্লা খাইয়েছে। রোজ এত এত বাজার করছে। আশেপাশের বাড়িতে এটা ওটা পাঠাচ্ছে। বাহারি রান্না হচ্ছে। মনিরা আক্তারের মনের আনন্দ যেন তার বয়স কমিয়ে দিয়েছে। ফোলা পা নিয়ে সে এদিক ওদিক ছুটে বেড়াচ্ছে।
আদিল আমার পাশেই বসে ছিল। সে নিজের হাতে পিরিচে কুমড়োর মোরব্বা তুলে আমাকে দিলো। জানলা দিয়ে উষ্ণ বাতাসের ঝাপটা এসে দেয়ালে ঝুলানো বহু বছরের পুরনা ক্যালেন্ডারের পাতা ফর ফর করে উড়িয়ে দেয়। আমি জানি, মনিরা আক্তার এখন আর রান্নাবান্না করতে পারেন না। রান্নার ঝি নাহারই সব করে। আদিল আসবে বলে তিনি নাহারকে দিয়ে মোরব্বা বানিয়ে রেখেছেন। তার মানে আদিল আসার আগে চিঠি দিয়েছিল। ছেলেটা মেলাদিন পর এলো তবে।

গ্রীষ্মের ঠা ঠা রোদ পড়া মধ্যাহ্ন। সামনে হাট করে খোলা দরজার বাইরে সটান শুয়ে আছে ধূসর সাদা ক্লান্ত উঠোন। আতা গাছের নিচে বসে সাদা-কালো একটা বিড়াল আপনমনে শরীর চেটে যাচ্ছে। কাপড় শুকানোর তারে কয়েকটা মেয়েলি শাড়ি কাপড়ের পাশে একটা জিন্সের প্যান্ট ঝুলে আছে। সেদিকে চোখ রেখে কড়া মিষ্টি মোরব্বার টুকরো কাটতে কাটতেই আদিলের কথা শুনছিলাম আমি।

কথা তেমন বেশি কিছু নয়। আদিল ভালো চাকরি করে। ঢাকায় সে একটা চব্বিশ শ’ বর্গফুটের ফ্ল্যাট কিনেছে। মায়ের তার বয়স হয়েছে, সর্বক্ষণ যত্ন ও খেয়াল রাখা প্রয়োজন। সে নানা ব্যস্ততায় থাকে, মায়ের খবর নেয়ার সময়ই করে উঠতে পারে না। কাজের চাপে গত তিন বছর সে বৃদ্ধা মাকে দেখতে একবারও গাঁয়ে আসতে পারেনি।
তাই মাকে আর গাঁয়ে ফেলে রাখার ইচ্ছে নেই।
নতুন কেনা বিশাল ফ্ল্যাটে ছেলে বউ, নাতি-নাতনি নিয়ে মায়ের হাসি খুশি জীবন দেখে ধন্য হতে চায় ছেলে।

আমার মতো বাড়িতে যে আসছে তাকেই আদিল তার পরিকল্পনার কথা বলছে।
মনিরা আক্তার ছেলের এত ভালোবাসা দেখে রীতিমতো গলে গেছেন। ছেলের সম্পর্কে বলার সময় তার চোখ চকচক করছিল স্নেহ ও গর্বে। বিষয়টা দেখে আমার শান্তি লাগছে।
হাসিব সরকার মানে মনিরার স্বামীকে আমি ভালোই চিনতাম। ডিলারশিপের ব্যবসা করত। মানুষ ভালো। পৈতৃক কিছু জমিজমা আর নিজের উপার্জনে স্ত্রী, দুই মেয়ে আর দুই ছেলে নিয়ে ভালোই চলত। তবে সেই ছোটবেলা থেকেই দেখেছি তার ছেলেমেয়েগুলো কেমন আত্মকেন্দ্রিক। বিশেষ করে বড় ছেলেটা তো বাবা-মায়ের কথাই শুনত না। হাসিব সরকারের মৃত্যুর পর বিষয়টা আরো পরিষ্কার বুঝতে পারি।

বয়সের তুলনায় যথেষ্ট শক্তপোক্ত লোকটা বছর পাঁচেক আগে হুট করে মরে গেল। অবশ্য সন্তানদের সবাই তখন সাবালক, উপযুক্ত। মেয়েদের কলেজে পড়া অবস্থাতেই ভালো ঘর দেখে বিয়ে দিয়েছিলেন। তারা যাতে সুখে থাকে সেজন্য নিজেও সাধ্যের মধ্যে দেয়ার ত্রুটি রাখেননি। সেই মেয়েরা বাপের মৃত্যুতে শেষ এসেছিল। ভরা সংসার রেখে মায়ের কাছে তাদের আর আসা হয় না। ছেলে দুইজনেই এসেছিল, তবে একা, বউরা আসেনি। বড় ছেলে নাবিল তখন বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। প্রচুর ব্যস্ততা। বাবাকে কবরে শুইয়ে সে আর দেরি করলো না। শোকাহত মা কিভাবে থাকবে, কোথায় থাকবে সে নিয়ে একটু ভাবল না পর্যন্ত। যাওয়ার সময় বলল, আমিন কাকু আমি যাই। মায়ের সামনে যেতে চাচ্ছি না। হয়তো স্বামীর জন্য কেঁদে কেটে একাকার করবে। এখন কোনো ন্যাকামি দেখার সময় আমার নেই।

নাবিল সেই যে গেল আর আসেনি। শুনেছি সে অস্ট্রেলিয়ায় সেটেল করেছে। আমি ভবঘুরে টাইপের লোক। নানা ধান্ধা করে সংসারের চাকা সচল রাখার চেষ্টা করি। জমির দালালিটায় আমার বেশ যশ আছে। কাজের প্রয়োজনে দশ গাঁয়ের বিভিন্ন বাড়িতে যাওয়ার মতো মনিরা আক্তারের বাড়িতেও যাই। আমার কাজই তো কে জমি কিনবে, কে বেচবে এসবের খবর রাখা।এই সুবাদে অনেকের ঘরের খবর, পেটের খবর আমি জানতে পারি। মাঝে মধ্যে মনিরা আক্তারের সাথে দেখা করতে এলে মনিরা আক্তার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, চারটা সন্তান পেটে ধরলাম, মরার সময় মুখে পানি দিতে একজনও পাশে থাকবে না। বুঝলেন আমিন ভাই, এইটারে কয় নসিব।

মোবাইল বর্তমান কালে যোগাযোগের সবচেয়ে সহজ মাধ্যম। লোকজনের কাছে শুনে, দেখে আমাকে দিয়ে মোবাইল কেনাল। কিন্তু ছেলেমেয়েদের কারো নম্বরই নেই। ফোন করবে কাকে। গ্রামের কেউ কেউ এসে তার মোবাইল থেকে আত্মীয়স্বজনকে ফোন করে যায়। একদিন আমি বললাম, ছেলেমেয়েদের চিঠি লেখেন। মোবাইল নম্বর দিতে বলেন। তখন ফোন করতে পারবেন। মনিরা আক্তার চোখে কম দেখে, সুতরাং তার হয়ে আমিই পত্র দুটো লিখে দিলাম। মনিরা আক্তার মুখস্থ ঠিকানা বললেন। সে ঠিকানা সঠিক ছিল না ভুল ছিল আল্লাহ পাক ভালো জানেন। তবে পত্রের কোনো উত্তর আসেনি। আদিল কে অবশ্য চিঠি লেখা যায়নি। কারণ মনিরার কাছে ছেলের ঠিকানা ছিল না।

মনিরা আক্তার একাই থাকে। স্বামীর রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে তার চলে যায়। একা বলে লোকজন খুব একটা ঠকায় না। তা ছাড়া দুই বাড়ি পরে হাসিব সরকারের ছোট ভাইয়ের সংসার। তারাও কম বেশি খোঁজ-খবর রাখে। আমি মাঝে মধ্যেই খোঁজখবর নেই। বুড়ির অর্থ সঙ্কট নেই। খাওয়া পরার কষ্ট নেই। তবুও তার অব্যক্ত কষ্ট আমাকে আহত করে। সন্তানদের কথা মনে করে চোখের পানি ফেলে। মাঝে মধ্যে কথা বলতে বলতে কাঁদে। মেয়েদের কতদিন দেখে না। আমার মাঝে মাঝে মনে হয় মনিরা আক্তারকে তার মেয়েদের বাড়ি বেড়িয়ে আনতে পারতাম যদি!

আদিল বেশ কয়দিন থাকল। যাওয়ার আগের দিন আমাকে ডেকে পাঠাল। মা-ছেলের কথা থেকে আন্দাজ করলাম তারা গ্রামের পাট একেবারেই তুলে দিতে চায়। আদিল ভালো চাকরি করে, মা-কে সাথে নিয়ে যেতে চায় এটার সাথে ‘সদ্য কেনা ফ্ল্যাটটা অল্প কিছু টাকার জন্য কোম্পানি হ্যান্ড ওভার করছে না’- এ বিষয়টা জড়িত আমি বুঝতে পারি। জমি ক্রয়-বিক্রয়ের বিষয় বুঝতে পেরে একটু নড়েচড়ে বসি।
হাসিব সরকার বিচক্ষণ মানুষ ছিলেন। বেঁচে থাকাকালীনই তিনি মেয়েদের প্রাপ্য দিয়ে গেছেন। আর বাকি সব সম্পত্তি দিয়ে গেছেন স্ত্রীর নামে। বড় ছেলে নাবিল যেহেতু কোনো খোঁজ খবর করে না তাই গ্রামে এখন যে জমিজমা ও বসতভিটে আছে মনিরা আক্তারের অবর্তমানে সবটাই আদিলের। এ ক্ষণে তাদের ইচ্ছে গ্রামের জমি এবং এই বসতভিটে বিক্রি করে একেবারে গ্রাম ছেড়ে যাবেন। আমাকে ডেকে পাঠানোর উদ্দেশ্য হলো যত দ্রুত সম্ভব এসব বিক্রির ব্যবস্থা করা।

আদিলের অনেক ব্যস্ততা। আমাকে এই বেচা-বিক্রির জন্য দশ দিন সময় ধরে দিলো। দশদিন পর আদিল এসে মা এবং টাকা নিয়ে যাবে।
এত অল্প সময়ে ভালো ক্রেতা পাওয়া যাবে না। সঠিক মূল্যও পাওয়া যাবে না- আমি তাদের একটু সময় নিয়ে বিক্রি করার পরামর্শ দিলাম। কিন্তু দেখলাম, তারা এতে অসন্তুষ্ট। বুঝলাম, আমি বেশি বললে ওরা অন্য দালাল ধরবে। সুতরাং আমি দশ দিনের মধ্যে সব জমি ও বসতভিটে বিক্রি করে দেয়ার কথা দিলাম।
আদিল চলে যাওয়ার দু’দিন পর গ্রীষ্মের ঝাঁজালো বিকেল। রোদ্দুর তখনো হাপড়ের মতো তাপ ছড়াচ্ছে। এত্তো গরম যে দুষ্টু পোলাপান পর্যন্ত খেলতে বেরোয়নি। আমি বেচা-বিক্রির কথা বলতে মনিরা আক্তারের বাড়িতে ঢুকে দেখি বাড়ির আসবাবপত্র বড় বড় ঠেলাগাড়িতে তোলা হচ্ছে। ঘটনা হলো, আদিল আসবাবপত্র বিক্রি করে গেছে। ক্রেতা সেসব নিয়ে যাচ্ছে।

মনিরা আক্তারকে দেখলাম কাঁঠাল গাছের নীচে একটা মাদুর পেতে বসে আছে। টুকরো টুকরো হলুদ রোদ মাদুরের গায়ে ঝিরিঝিরি কাটছে। হু হু গরমে গাছের পাতা নড়লে একটু আধটু স্বস্তি মেলে। আমি বললাম, ভাবি, এসব তো পরেও নিতে পারত। বাড়ি যে কয়দিন বিক্রি না হয়, আপনি থাকবেন কই?
মনিরা আক্তার আঁচলে মুখের ঘাম মুছে ম্লান কণ্ঠে বলল, ভাইরে একটু তাড়াতাড়ি বিক্রির ব্যবস্থা করেন। আদিল বলেছে নতুন ফ্ল্যাটে উঠতে না পেরে তার অনেক লস হয়ে যাচ্ছে। আর আমার কথা ভাববেন না, কয়দিনের ব্যাপার তো, মাদুর-বালিশে রাত কাটিয়ে দেবো।
দশ দিন বাদে আদিল মাকে নিতে এসেছে। বেঁচা বিক্রির টাকা আমার কাছেই আছে।
খবর পেয়ে আমি টাকা দিতে এসেছি। মনিরা আক্তারের সাথে মস্তো এক বস্তা আর দুটো কাপড়ের ব্যাগ। এত কিছু দেখে আদিল বিরক্ত কণ্ঠে বলল, এত কি নিয়েছো সাথে?
ছেলের বাড়ি যাবে বলে মনিরা আক্তার কয়েকপদ আচার, নারকেল, নাড়ু ইত্যাদি বস্তায় নিয়েছে। আর ব্যাগ দুটোয় পরনের কাপড় জামা।

কিন্তু আদিল সাথে একটা কাপড়ের ব্যাগ ছাড়া আর কিছুই নিতে চাইলো না। বলল,এখানে তো গাড়ি আসে না। আমাদের কে বাসে যেতে হবে। বাসে এত কিছু নিয়ে যাওয়া বড্ড ঝামেলা। ঢাকায় চলো, তোমার কাপড় চোপড় সব নতুন করে কিনে দেবো। আর নাড়–-ফাড়– এসবও বড় বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে পাওয়া যায়। তোমার বউ মার সাথে গিয়ে ইচ্ছে মতো কিনে নিও।

পাড়াপড়শী অনেকেই বিদায় দিতে এসেছে। মনিরা আক্তার সবার কাছে ক্ষমা ও বিদায় চেয়ে রিকশায় উঠল। আদিল আগেই রিকশায় উঠে বসেছিল। রিকশা রিকশা ধীরে ধীরে আমাদের চোখের আড়াল হয়ে গেল।
বাজারে, জমশেদের চায়ের দোকানে মেলা ভিড় আর লোকজনের উত্তেজিত কথাবার্তা শুনে এগিয়ে গেলাম। পত্রিকার একটা খবর নিয়ে সবাই কথা বলছে। কি হয়েছে একজনকে জিজ্ঞাসা করলাম। সে বললো ‘মা কে বাসস্টপে দাঁড় করিয়ে বাসায় যাওয়ার জন্য সিএনজি ডাকতে গিয়ে ছেলে আর ফিরে আসেনি। গত দুই দিন ধরে বৃদ্ধা মা বাসস্টপে যাত্রী ছাউনিতে রাত কাটাচ্ছে। বৃদ্ধার কাছে কোনো টাকা-পয়সাও নেই। তাই দুদিন ধরে সে অভুক্ত। ছেলের নাম ছাড়া, ছেলে কি করে, কোথায় থাকে এসব কিছুই জানা নেই বৃদ্ধা।’ খবরটা শুনে বুকটা ছাৎ করে উঠল। মনিরা আক্তারও ছেলের সাথে গ্রাম ছেড়েছে আজ দুই দিন।

মনে মনে প্রার্থনা করলাম, হে আল্লাহ মনিরা আক্তারের সাথে যেন এমনটা না ঘটে। হাত বাড়িয়ে পত্রিকাটা চাইলাম। কে একজন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, আহা কী পাষণ্ড সন্তান। বৃদ্ধা মা কে এমন করে ফেলে গেল!