মুনাফিকের কিছু বৈশিষ্ট্য

Sep 19, 2019 04:56 pm
মুনাফিকের কিছু বৈশিষ্ট্য

 

মুনাফিক একটি নিকৃষ্ট চরিত্রের নাম। আমাদের সমাজে কিছু মুসলমান রয়েছে যারা নামে ইসলামকে ব্যবহার করে কিন্তু কাজে নয়। হজরত রাসূলুল্লাহ সা:-এর আমলেও এ ধরনের মুসলমান ছিল। তাদের কারণে তখনো মুসলমানদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি হয়েছিল। মুনাফিক অর্থ হলো কথায় এবং কাজে দ্বিমুখী আচরণ করা। মুখে এক রকম এবং কাজে আরেক রকম ভাব পোষণ করা। মুনাফিকেরা মানুষের সামনে এক ধরনের এবং পেছনে আরেক ধরনের আচরণ করে থাকে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা: থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা: ইরশাদ করেন, ‘চারটি স্বভাব এমন যার সবগুলো কারো মধ্যে থাকলে সে পুরোদস্তুর মুনাফিক, আর যার মধ্যে তার কোনো একটি থাকবে, সে যতক্ষণ তা পরিত্যাগ না করবে ততক্ষণ পর্যন্ত তার মধ্যে মুনাফিকির একটি স্বভাবই থাকবে। স্বভাব চারটি হচ্ছে- যখন তার কাছে আমানত রাখা হয় সে তাতে খিয়ানত করে, যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, যখন কোনো ওয়াদা করে তা ভঙ্গ করে এবং যখন কারো সাথে ঝগড়া করে গালাগালি করে’ (বুখারি ও মুসলিম)।

আমানতের খিয়ানতে ইহ ও পরকালীন অকল্যাণ : কারো কাছে কোনো অর্থসম্পদ গচ্ছিত রাখার নাম আমানত। যিনি গচ্ছিত সম্পদ যথাযথভাবে সংরক্ষণ করেন এবং এর প্রকৃত মালিক চাওয়া মাত্র তা অক্ষত অবস্থায় ফিরিয়ে দেন, তিনি আমানতদার। আর গচ্ছিত সম্পদ যথাযথভাবে মালিকের কাছে ফেরত না দিয়ে আত্মসাৎ করা আমানতের খিয়ানত।
অনেকে শুধু টাকাপয়সা গচ্ছিত রাখাকেই আমানত ভাবেন। কিন্তু আমানতের গণ্ডি এত সীমিত নয়, বরং এর পরিধি ব্যাপক ও বিস্তৃত। মানুষের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের সাথে আমানত অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তাই সমাজের প্রত্যেকেই একেকজন আমানতদার। রাষ্ট্র পরিচালনা, ভোট প্রদান, সাংবাদিকতা, অফিসিয়াল কাজকর্ম, শিক্ষকতা, ব্যবসায় বাণিজ্য, শ্রম-মজুরি সবই আমানত। এগুলো যথাযথভাবে পালন না করা খিয়ানতের অন্তর্ভুক্ত। তা ছাড়া ইসলামী জীবনপদ্ধতির সব করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়ের সাথে আমানতদারির সম্পর্ক রয়েছে। এমনকি প্রত্যেক মানুষের শরীর ও প্রাণ আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের কাছে আমানত।

আল্লাহ তায়ালা মানুষকে আমানত রক্ষার নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের আদেশ দিচ্ছেন যে, তোমরা আমানত তার মালিককে ফেরত দেবে’ (সূরা নিসা, আয়াত-৫৮)। আমানতদারির পুরস্কার ঘোষণা করে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যারা আমানত রক্ষা করে তারা ফেরদাউস নামক জান্নাতের অধিকারী হবে, সেখানে তারা চিরকাল অবস্থান করবে’ (সূরা মুমিনুন, আয়াত-১১)।

আমানতের খিয়ানত প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, ‘যার মধ্যে আমানতদারি নেই, সে মুমিন মুসলমান নয়।’ তিনি আমানতের খিয়ানতকারীকে মুনাফিক আখ্যা দিয়েছেন। প্রচুর পরিমাণ নেক আমল করার পরও আমানতের খিয়ানতকারীকে আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। হাশরের মাঠে আল্লাহ তাকে আমানতকারীর আমানত আদায়ের জন্য বলবেন। তখন আমানত পরিশোধ করতে না পারার দরুন তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
ফেরেশতা এবং সব নবী-রাসূল ছিলেন আমানতদার। বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ সা: ছিলেন আমানতদারির মূর্তপ্রতীক। চরম শত্রুরাও তাঁর কাছে সম্পদ আমানত রাখত। সে জন্য তৎকালীন নীতিহীন বিশ্বে তিনি ‘আল-আমিন’ বা ‘পরম বিশ্বস্ত’ উপাধি লাভ করেছিলেন। আমানতদার ব্যক্তি সমাজের সবচেয়ে প্রশংসনীয় ও সম্মানিত। আমানতদারি এমন এক মহৎ গুণ, যার ওপর জাতির উন্নতি ও সমৃদ্ধি নির্ভরশীল।

আমানত রক্ষার ওপর নির্ভর করে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নতি। আর কোনো দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক নৈরাজ্য ও দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হয় আমানতদারির অভাবে।
ওয়াদা ভঙ্গকারীর কোনো ধর্মই নেই : ওয়াদা আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ অঙ্গীকার, চুক্তি, প্রতিশ্রুতি, প্রতিজ্ঞা ইত্যাদি। ইসলামী পরিভাষায় কারো সাথে কেউ কোনো অঙ্গীকার করলে, কাউকে কোনো কথা দিলে বা লিখিত চুক্তি করলে তা পালন করার নাম ওয়াদা। যাপিত জীবনে মানুষ মানুষের সাথে বিভিন্ন রকম ওয়াদা বা প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকে। এই ওয়াদা পালন করা মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ও ঈমানের অঙ্গ। সংসার ও সমাজ জীবনে ওয়াদা রক্ষাকারীরা মানুষের কাছে অত্যন্ত সম্মানিত ও গ্রহণযোগ্য। সবাই ওয়াদা পালনকারীকে শ্রদ্ধার চোখে দেখে। আল্লাহও তাকে ভালোবাসেন। ওয়াদা রক্ষা করা আল্লাহর একটা গুণও বটে। বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ সা: পৃথিবীতে ওয়াদা পালনের এক আদর্শ দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। যেকোনো ধর্মে ওয়াদা পালনের গুরুত্ব রয়েছে। ইসলামে এর গুরুত্ব অনেক বেশি। ইসলামে ওয়াদা ভঙ্গকারীকে মুনাফিকের সাথে তুলনা করা হয়েছে। তাদের জন্য পরকালে রয়েছে কঠোর শাস্তি। ওয়াদা ভঙ্গ করা মারাত্মক অপরাধ। ওয়াদা পালনের প্রতি জোরালো তাগিদ দিয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘এবং তোমরা ওয়াদা পালন করবে, ওয়াদা সম্পর্কে তোমাদের কাছে কৈফিয়ত চাওয়া হবে’ (সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত-৩৪)।

ওয়াদা রক্ষা করার সামর্থ্য থাকলে এবং তা পালন করতে ধর্মীয় কোনো বাধা না থাকলে যেকোনো মূল্যে তা রক্ষা করা ওয়াজিব। বিশেষ কোনো যৌক্তিক কারণে ওয়াদা রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়লে, যাকে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে তাকে বিনয়ের সাথে নিজের অপারগতা জানিয়ে ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে। আমরা পৃথিবীতে আসার আগে আমাদের পরম সৃষ্টিকর্তার কাছে তাঁর আদেশ-নিষেধ পালনের যে অঙ্গীকার করে এসেছি, এখন আমরা তা ভুলে গেছি। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘যারা আল্লাহর সাথে দৃঢ় অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গ করে, যে সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রাখতে আল্লাহ আদেশ করেছেন তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায়, তারা অভিশাপ পাওয়ার যোগ্য এবং তাদের জন্য রয়েছে আখিরাতে নিকৃষ্ট বাসস্থান’ (সূরা রাদ, আয়াত-২৫)।

ওয়াদা পালন না করলে ব্যক্তির গ্রহণযোগ্যতা কমে যায়। ঈমান নষ্ট হয়। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা ও অশান্তি দেখা দেয়। রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘যে ওয়াদা রক্ষা করে না তার কোনো ধর্মই নেই।’

মিথ্যা বলা মারাত্মক অপরাধ : মিথ্যা বলার চেয়ে মারাত্মক অপরাধ আর নেই। রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালা এবং বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ সা: মিথ্যাবাদীকে প্রচণ্ড ঘৃণা করেন। কুরআন ও হাদিসে মিথ্যাবাদীর ভয়ানক পরিণতির কথা বলা হয়েছে। একটি মিথ্যাকে সত্য বলে প্রমাণ করার জন্য হাজারও ছলচাতুরি এবং আরো অনেক মিথ্যা বলার প্রয়োজন হয়। এরপরও মিথ্যা কখনো সত্য হয় না। মিথ্যা মিথ্যাই থেকে যায়। যারা মিথ্যাচার করে বেড়ায় তারা সংসারে, সমাজে এবং দেশে মহাদুর্যোগ সৃষ্টি করতে পারে। মিথ্যাবাদীর পাল্লায় পড়ে অনেক নিরীহ মানুষ প্রতারিত এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মিথ্যাবাদীর ওপর আল্লাহ তায়ালার অভিশাপ বর্ষিত হয়।

মিথ্যা বলা সব পাপাচারের মূল। যে মিথ্যাকে বর্জন করে সে কোনোরূপ পাপই করতে পারে না। মিথ্যাই সব ধরনের অপরাধে উৎসাহ-প্রশ্রয় দিয়ে থাকে। মিথ্যা বলা মুনাফিকের লক্ষণ। মিথ্যা বলে বেচা-কেনাকারীর সাথে বিচার দিবসে আল্লাহ কথা বলবেন না। হাসি-রসিকতা কিংবা স্বাভাবিক অবস্থা- মিথ্যা সর্বাবস্থায়ই হারাম ও অবৈধ। শিশুদের সাথে খেলাধুলাতেও মিথ্যা থেকে বিরত থাকা জরুরি। কারণ এটা শিশুদের অন্তরে গেঁথে যায়। রাসূলুল্লাহ সা: মিথ্যা বলা কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘মিথ্যা তো তারাই বানায় যারা আল্লাহর নিদর্শনসমূহের ওপর ঈমান রাখে না। বস্তুত তারাই মিথ্যাবাদী’ (সূরা নাহল, আয়াত-১০৫)। রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে তাই বলে বেড়ায়’ (মুসলিম)।

মিথ্যা বলার পরিণাম খুবই ধ্বংসাত্মক। এর জন্য দুনিয়াতে রয়েছে ধ্বংস আর আখিরাতে রয়েছে অপমান ও লাঞ্ছনা। মিথ্যার কারণে অন্তরে কপটতার সৃষ্টি হয়। মিথ্যা পাপাচার ও জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়। মিথ্যাবাদীদের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয় না। মিথ্যার কারণে দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জাগতেই চেহারা বিবর্ণ ও মলিন হয়ে যায়। বিচার দিবসে মিথ্যাবাদীর চোয়াল চিরে গর্দান পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হবে। রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘ধ্বংস তার জন্য যে লোক হাসানোর জন্য কথা বলে এবং এতে সে মিথ্যার আশ্রয় নেয়। ধ্বংস তার জন্য, ধ্বংস তার জন্য’ (তিরমিজি ও আবু দাউদ)।

ঝগড়া-বিবাদে গালাগালি করা নিকৃষ্ট স্বভাব : মূলত মুনাফিক ব্যক্তিই অন্যের সাথে কলহ-বিবাদে লিপ্ত হলে মুখ খারাপ করে এবং অবলীলায় অশ্রাব্য গালমন্দ শুরু করে দেয়। যাপিত জীবনে কত রকম মানুষের সাথেই মেলামেশা ও লেনদেন করতে হয়। এতে কখনো কখনো মতের অমিল দেখা দেয় এবং মাঝে মধ্যে তা কলহ-বিবাদ পর্যন্ত গড়ায়। কিন্তু একজন প্রকৃত মুমিন কোনো অবস্থাতেই মুখ খারাপ করতে পারে না। সব সময় সে নিজ ভদ্রতা, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের ব্যাপারে সচেতন থাকবে। দৃষ্টিভঙ্গিগত মতভেদ হোক, চিন্তা-চেতনার অমিল হোক, রাজনৈতিক কিংবা ব্যবসায়িক বিরোধ হোক, কোনো অবস্থাতেই একজন মুমিন তার মুখ দিয়ে মন্দ বাক্য উচ্চারণ করবে না। হাদিসের দৃষ্টিতে এরূপ করা মুনাফিকের আলামত।

লেখক : গ্রন্থকার