Installateur Notdienst Wien hacklink

কাশ্মিরের জানা-অজানা

Oct 15, 2019 05:52 pm
কাশ্মিরের জানা-অজানা

 

১৯৬৫ সাল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ্ মুসলিম হলের অর্থনীতির অনার্স দ্বিতীয়বর্ষের ছাত্র আমি। এ সময় সেপ্টেম্বরে কাশ্মির প্রশ্নে ভারত বনাম পাকিস্তান যুদ্ধ বেধে গেল। আমাদের ক্লাস নিয়মিত চলছিল। সন্ধ্যার পর মাঝে মধ্যে সাইরেন বাজত কিংবা রাতে। আমরা সবাই দৌড়ে গিয়ে হলের নিচতলায় ডাইনিং রুমের সামনের খোলা জায়গায় জড়ো হতাম। হলের মধ্যে এ জায়গাটাই সবচেয়ে নিরাপদ। আমাদের ধারণা হলো- বোমা পড়লে এ জায়গাটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। জায়গাটা দুর্গের মতো। উপর-নিচ চার দিক থেকে সুরক্ষিত। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের কোথাও একটি বোমা পড়েনি। এখানকার বাঙালি মুসলমানদের না ক্ষেপানোর এ ধরনের ভারতীয় কৌশলের সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্য ছিল বলে মনে হয়, যা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধকালে পাকিস্তানের পক্ষে এবং ভারতের বিপক্ষে পূর্ব পাকিস্তানের জনমত ব্যাপক ও সঙ্ঘবদ্ধ ছিল। রাস্তাঘাটে চলাচলকারী গাড়ির উইন্ড শিল্ডে ‘ক্রাশ ইন্ডিয়া’ স্টিকার লাগানো হতো। এ ধরনের পোস্টারও জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে লাগিয়ে দিত। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের জনমত একতরফাভাবে ভারতের বিপক্ষে ছিল কাশ্মির যে পাকিস্তানেরই অংশ হওয়া যুক্তিসঙ্গত- এ বিষয়টি পূর্ব পাকিস্তানবাসী কায়মনোবাক্যে বিশ্বাস করত। এ জন্য তারা দৃশ্যত ভারতের বিরুদ্ধে লড়তেও প্রস্তুত ছিল।

আসলে কাশ্মির সমস্যা ভারতেরই সৃষ্টি। পাকিস্তান তাতে জড়িয়ে পড়ে এবং ১৯৪৭-১৯৪৮ সালে এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধও হয়েছিল। ভারত উপমহাদেশ ’৪৭-এ হিন্দু ও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে দুটি বাষ্ট্রে ভাগ হয়েছে। সে কারণে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল কাশ্মিরের ওপর পাকিস্তান দাবি করতে পারে। ভারত কাশ্মিরের দুই-তৃতীয়াংশ সামরিক শক্তি বলে দখল করে রেখেছে সেটাই অস্বাভাবিক এবং উপমহাদেশ যে নীতির বলে ভাগ হয়েছিল সে নীতির পরিপন্থী। পাকিস্তান তার প্রভাবাধীন আজাদ কাশ্মিরের জন্য আলাদা সরকার গঠন করেছে। তা পাকিস্তানের অনুগত। কাশ্মিরি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার অনস্বীকার্য। হিন্দু ডোগরা রাজার খেয়ালের বসে মুসলিম অধ্যুষিত কাশ্মির যে ভারতের অংশ হলো, তা মেনে নেয়া যায় না ইতিহাসের নিরিখে। এ কথার সত্যতা যাচাই করে দেখা যে প্রয়োজন, জাতিসঙ্ঘও তা মেনে নিয়েছে। তবে এটা মানতে রাজি নয় ভারত।

মনে হয়ত কাশ্মিরি জনগণ আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার পেলে পাকিস্তানের সাথে যোগ দেয়ার রায় দেবেই, এটা নিশ্চিত বলা যায় না। কাশ্মিরি জনগণ এই অধিকার পেলে কাশ্মিরকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের পক্ষেও রায় দিতে পারে। আমার বিশ্বাস, তারা তাই করবে। সেটাই কাশ্মিরের জন্য মঙ্গলজনক। ভারত ও পাকিস্তান উভয়েরই উচিত কাশ্মির নিয়ে নিজেদের মধ্যে টানা হ্যাঁচড়া না করে কাশ্মিরকে সেখানকার জনগণের হাতেই তুলে দেয়া। কাশ্মির একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করাই কাশ্মির সমস্যার বাস্তব সমাধান। চার দিকে স্থলবেষ্টিত স্বাধীন কাশ্মিরকে সমুদ্রপথে বহির্বিশ্বের সাথে যোগাযোগের জন্য মুম্বাই বা করাচি সমুদ্রবন্দর অথবা উভয় বন্দর স্বেচ্ছায় বেছে নেয়ারও অধিকার দেয়াও সঙ্গত।

কাশ্মির সমস্যা এই উপমহাদেশের জনগণের আর্থসামাজিক, সাংস্কৃতিক ও গণনিরাপত্তার ক্ষেত্রে জাতীয় সমস্যা সৃষ্টি করেছে। এ সঙ্কটকে আর এগিয়ে নিয়ে যাওয়া কিছুতেই সমীচীন নয়। উপমহাদেশের ১৯৪৬-১৯৪৭ সালে বিরাজমান মনোভাব ভারত এবং পাকিস্তান দুই রাষ্ট্রেরই পরিত্যাগ করা জরুরি। কাশ্মিরকে কেন্দ্র করে ভারত অধিকৃত কাশ্মিরে লোকক্ষয় এবং ভারত পাকিস্তানের মধ্যে ছোটবড় পুনঃপুন যুদ্ধে প্রাণহানি ও সামরিক প্রতিযোগিতা বন্ধ করা এ দুটি দেশের আর্থসামাজিক অগ্রগতি এবং ভারতের মুসলমানদের ওপর মানসিক চাপ দূর করার পূর্বশর্ত। কাশ্মিরি জনগণ যে দুঃস্বপ্নের ভেতর দিয়ে দিন অতিবাহিত করছে এর ত্বরিত অবসান হতে হবে। এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপিত হবে কি হবে না তা অনেকাংশেই নির্ভর করছে এ সমস্যা সমাধানের ওপর। কাশ্মির সমস্যার সুড়ঙ্গপথে বিশ্বের বৃহৎ শক্তিগুলো এ অঞ্চলে তাদের অশুভ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব সৃষ্টি করে চলেছে এবং এ দুই দেশেই অস্ত্র বিক্রির সুযোগ করে নিচ্ছে। এসব কিছুই এ অঞ্চলের জন্য অমঙ্গলজনক। এ কারণে স্বাধীন কাশ্মিরের অভ্যুদয় হওয়া জরুরি।

লেখক : অর্থনীতির অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও ভাইস প্রিন্সিপাল, মহিলা সরকারি কলেজ, কুমিল্লা