একক মায়েদের আরেক লড়াই

Oct 20, 2019 03:48 pm
একক মায়েদের আরেক লড়াই

 

বিয়ের বছর দুই যেতেই পুত্রসন্তানের মা সাহিদা। ছেলের তিন বছর বয়সেই স্বামী নিরুদ্দেশ। সন্তান নিয়ে বাবা-মায়ের কাছে থাকে। তিন-চার বছরের মাথায় ওকে আবার বিয়ে দেয়। সেই ঘরে এক কন্যাসন্তান। একদিন জানতে পারে, বর্তমান স্বামী আগেই একটা বিয়ে করেছে। বনিবনা হচ্ছে না দেখে আলাদা থাকে সাহিদা, তবে ডিভোর্স হয়নি। গার্মেন্টসে চাকরি করে, সন্তান দেখার জন্য গ্রাম থেকে মাকে নিয়ে আসে। আগের পুত্রসন্তান গ্রামে সাহিদার বাবার কাছে থাকে। সাহিদা এই সমাজের সিঙ্গেল মা, দুই স্বামীর থেকে পাওয়া দুই সন্তানের দায়দায়িত্ব সব এখন সাহিদার।

লোপা প্রেমে পড়ে বিয়ে করে আক্কাসকে। পরপর তিন সন্তান জন্ম নেয়। আক্কাস কাজকর্ম ছেড়ে বেকার ঘুরে। লোপা চাকরি করে টাকা উপার্জন করে সংসার চালায়। আক্কাসও টাকা-পয়সা নিয়ে যায়। তবুও যাচ্ছিল ঠেলতে ঠেলতে। হঠাৎ শুনে আক্কাস আবার বিয়েও করেছে। সন্তানদের প্রতি আক্কাসের কোনো দায়িত্ব আগেও ছিল না, পরও নেই। লোপা ভাবল, সংসার যখন তার টাকায় চলে; তাহলে স্বামী পুষবে কেন। এরপরই ছাড়াছাড়ি। ছেলেকে হোস্টেলে রাখে। মেয়েকে মা-বাবার কাছে আরেকজনকে নিজের সাথে রেখে চাকরি করে চলছে। এই সমাজে এই সময়ে তিন সন্তানের পেছনে কত খরচ হতে পারে ভাবলেই অনেকে ভয় পেয়ে যাবে। সেখানে লোপার জীবনযুদ্ধ। লোপা বলে, ‘তবুও আগের চেয়ে ভালো আছি। মানসিক শান্তিতে আছি।’

ড্যানি রহমান একজন সিঙ্গেল মা। ডিজ্যাবিলিটি আছে, এমন শিশু জন্মদানের পর তার সংসার ভেঙে গিয়েছিল। জন্মদাতা সন্তানকে ছেড়ে চলে গেলেও মা হিসেবে ড্যানি এককভাবেই ছেলেকে বড় করে তুলেছেন। বর্তমানে গড়ে তুলেছেন স্নায়বিক প্রতিবন্ধকতা আছে এমন শিশুদের জন্য কারিগরি শিক্ষার প্রতিষ্ঠান। একক মা হিসেবে অনেক ধরনের প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাকে।

ড্যানি রহমান বলছিলেন ‘একক মা একটি পরিচয় হতে পারে, এ জায়গাটিতে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ সামাজিকভাবে আসতে পারেনি। সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টি একদমই কম। সম্প্রতি হয়তো এ কথা সামনে আসছে। কিন্তু এখনো শুধু সামাজিকভাবেই নয়, পরিবারের ভেতরেও এই গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টি হয়নি যে, আপনি সিঙ্গেল মা হিসেবে থাকবেন। অনেক নারী অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী না বা শক্তিশালী অবস্থানে থাকে না।

আর সাইকোলজিক্যালি নারী হিসেবে এতটা শক্তিশালী এখনো সবাই হয়নি যে নিজের আইডেনটিটি নিশ্চিত করবে। একা মা হিসেবে সামনে এগিয়ে চলার ক্ষেত্রে সহযোগিতার জায়গা এখনো সামাজিকভাবে বা পারিবারিকভাবে সৃষ্টি হয়নি। এখনো ধরে নেয়া হয় একজন নারী তার একটা সাইনবোর্ড থাকবে যে সে তারা বাবা বা ভাইয়ের অধীনে থাকবে বা তার স্বামীর সাথে থাকবে। প্রত্যেকের জীবনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য নিজস্ব পছন্দ বা লক্ষ্য থাকে। কিন্তু আমরা অনেকেই মেয়ে হিসেবে নিজেদের সম্মান দেয়ার বিষয়টি সন্তান, পরিবার, সমাজ সব কিছুর ঊর্ধ্বে উঠে নিজেদের সম্মান দেয়ার জায়গা বাংলাদেশের পরিবেশে নারীরা অনেকেই তৈরি করতে পারেনি বা তৈরি হয়নি। কিন্তু সেই জায়গাটা যখন মেয়েরা তৈরি করতে পারবে, তাহলে যে স্ট্রাগলের জায়গাটা আমরা পার হয়েছি, ওই স্ট্রাগলের জায়গাটা হয়তো কমবে। (তথ্যসূত্র : ১৪ মে ২০১৭, বিবিসি বাংলা)।

বাংলাদেশে দেখা যায় বেশির ভাগ সিঙ্গেল মা-ই বিয়ের পর স্বামীর পরকীয়া, দ্বিতীয় বিয়ে, নির্যাতন, বিয়ে বিচ্ছেদ ও স্বামীর মৃত্যুর কারণে সন্তানদের নিয়ে একা জীবন কাটান। শুধু ঢাকা শহরেই আলাদা থাকছেন এমন সিঙ্গেল মায়েদের হার ২১ দশমিক ২ শতাংশ। বিয়ে বিচ্ছেদের কারণে ৩৪ দশমিক ৬ শতাংশ এবং স্বামী মারা যাওয়ার কারণে ৪৪ দশমিক ২ শতাংশ মা একাকী জীবনযুদ্ধ করেছেন। বেশ কিছু মা আছেন, যারা সন্তানের সামাজিক স্বীকৃতি পাননি। আরেক সমীক্ষায় দেখা গেছে, সিঙ্গেল মায়েদের বেশির ভাগই মানে ৪৪ দশমিক ২ শতাংশ কর্মজীবী। সংসার, চাকরি ও সন্তান সামলাতে গিয়ে তারা একসময় হাঁপিয়ে যান।

বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে একক মায়েদের সন্তানকে বড় করে তোলার ক্ষেত্রে নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়। কিন্তু নিজের সুস্থ জীবন, অশান্তি আর সন্তানের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে সন্তান নিয়ে সিঙ্গেল হতেও বাধ্য হন।

বিষয়টি অনেক দিনে চিন্তার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সন্তানের বড় হওয়ার পেছনে বাবা-মা দু’জনেরই প্রয়োজন একটা পরিবারের। সেখানে সিঙ্গেল মায়ের সাথে সন্তান বড় হতে গিয়ে বাবার স্নেহ, মমতা, শাসন সবচেয়ে বঞ্চিত হচ্ছে। বঞ্চিত হচ্ছে একটা সুন্দর পরিবারের পরিবেশ থেকেও। এতে করে সন্তান ব্রোকেন পরিবারের হয়ে বড় হচ্ছে।

সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই আলাদা হলেও বাবার শূন্যতা সন্তানের জন্য অনেক ক্ষেত্রে অমঙ্গল হয়ে যাচ্ছে। একটি শিশুর জন্য সুন্দর একটি পারিবারিক পরিবেশ জরুরি; যেখানে বাবা-মা দু’জনই থাকবে। তারপরও এসব মা সন্তানকে ভালোভাবে মানুষ করার জন্য প্রতিনিয়ত লড়াই করে যাচ্ছেন।