ব্যভিচারের চেয়েও জঘন্য একটি পাপ

Oct 24, 2019 02:24 pm
ব্যভিচারের চেয়েও জঘন্য একটি পাপ

 

গীবত বা পরনিন্দা করা ইসলামের দৃষ্টিতে জঘন্য অপরাধ। কোনো ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তার দোষ-ত্রুটি আলোচনা করার নামই গীবত। চাই তা কথা, ইশারা-ইঙ্গিত বা লেখনীর মাধ্যমে হোক। গীবত আরবি শব্দ, বাংলায় বলা হয় পরনিন্দা। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কুরআন কারিমে এরশাদ করেন- ‘হে মুমিনগণ! তোমরা অনেক ধারণা থেকে বেঁচে থাকো। নিশ্চয়ই কতক ধারণা গোনাহ। কারো গোপনীয় বিষয় সন্ধান করো না। তোমাদের কেউ যেন কারও পশ্চাতে নিন্দা না করে। তোমাদের কেউ কি স্বীয় মৃত ভাইয়ের গোশত ভক্ষণ করতে পছন্দ করবে? বস্তুত তোমরা তো একে ঘৃণাই করো’ (সূরা হুজুরাত : ১২)। পবিত্র কুরআনে আরো এরশাদ হয়েছে-‘প্রত্যেক পশ্চাতে ও সম্মুখে পরনিন্দাকারীর জন্য দুর্ভোগ’ (সূরা হুমাজাহ : ০১)। মহান আল্লাহ তায়ালা আরো এরশাদ করেন- হে মুমিনগণ! তোমরা একে অপরের প্রতি দোষারোপ করো না’ (সূরা হুজরাত : ১১)।

গীবত কী? এ সম্পর্কে হজরত আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত, একদা রাসূল সা: সাহাবায়ে কেরমগণকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা কি বলতে পারো, গীবত কাকে বলে? সাহাবিগণ আরজ করলেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই সা: ভালো জানেন। তখন রাসূলুল্লাহ সা: এরশাদ করলেন, গীবত হলো কোনো ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তার এমন দোষ-ত্রুটি বর্ণনা করা, যা শুনলে সে অসন্তুষ্ট হয় এবং অন্তরে আঘাত পায়, তাকেই গীবত বলে। অর্থাৎ কারো অগোচরে তার এমন দোষ বলা, যা বাস্তবেই তার মধ্যে আছে, তাই গীবত বা পরনিন্দা। আর যদি তার মধ্যে সেই দোষ না থাকে, তবে তা অপবাদ (তুহমত) হবে। যা গীবত থেকেও মারাত্মক গুনাহ (মুসলিম : ২৫৮৯)। হজরত আবু সাঈদ খুদরী রা: থেকে বর্ণিত রাসূল সা: এরশাদ করেন- ‘গীবত ব্যভিচারের চেয়েও জঘন্যতম গোনাহ। তিনি রাসূল সা:-এর কাছে জানতে চাইলেন এটা কিরূপে? তিনি বললেন, এক ব্যক্তি ব্যভিচার করার পর তাওবাহ করলে তার গোনাহ মাফ হয়ে যায়। কিন্তু যে গীবত করে তার গোনাহ প্রতিপক্ষের মাফ না করা পর্যন্ত মাফ হয় না’ (তিরমিজি : ২৪১২)। হজরত অবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত রাসূল সা: এরশাদ করেন, তোমরা একে অপরের পরনিন্দা করো না। আর পরনিন্দা হলো অপর ভাইয়ের এমন দোষ বর্ণনা করা যা তার অপছন্দ। যে ব্যক্তি অপর মুসলমানদের দোষ অনুসন্ধান করে আল্লাহ তার দোষ অনুসন্ধান করেন।

আল্লাহ যার দোষ অনুসন্ধান করেন তাকে লাঞ্ছিত ও অপমানজনক শাস্তি দেবেন (তিরমিজি : ২৬৩৯)। হাদিসে বর্ণিত আছে, একদা কোনো প্রয়োজনে এক বেঁটে মহিলা রাসূলের সা: খেদমতে আসেন। সে মহিলা চলে যাওয়ার পর হজরত আয়েশা রা: রাসূল সা:-এর কাছে ওই মহিলার দৈহিক কাঠামো বেঁটে হওয়ার ত্রুটি বর্ণনা করেন!

আয়েশা রা:-এর এ কথা শুনে রাসূল সা:-এর চেহারা মলিন হয়ে গেল। তখন রাসূল সা: বললেন, আয়েশা তুমি ওই মহিলাটির গীবত করলে! তুমি এমন কথা বললে যা সমুদ্রে নিক্ষেপ করলে সমুদ্রের পানির রং পরিবর্তন হয়ে কালো হয়ে যেত। আয়েশা রা: বলেন, তার বেঁটে হওয়ার কথাই তো বলছি এবং এই ত্রুটি তো তার মধ্যে রয়েছে। রাসূল সা: বলেন, হে আয়েশা যদিও তুমি সত্য কথা বলেছ কিন্তু তুমি তার ত্রুটি বর্ণনা করায় তা গীবত তথা পরনিন্দা হয়ে গেল (মুসলিম : ২৭৬১)।

রাসূল সা: এরশাদ করেন, ‘তোমরা গীবত বা পরনিন্দা করা থেকে বেঁচে থাকবে। কারণ তাতে তিনটি ক্ষতি রয়েছে। প্রথমত, গীবতকারীর দোয়া কবুল হয় না। দ্বিতীয়ত, গীবতকারীর কোনো নেক আমল কবুল হয় না এবং তৃতীয়ত আমলনামায় তার পাপ বৃদ্ধি হয়ে থাকে (বুখারি : ২৮৩৭)। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা: থেকে বর্ণিত, রাসূল সা: বলেন, ‘যখন তুমি কারো দোষ বর্ণনা করতে ইচ্ছে করো, তখন নিজের দোষের কথা স্মরণ করো যাতে গীবতের কারণে জাহান্নামে যাওয়া থেকে বাঁচতে পার। যদি নিজের দোষ না দেখে শুধু অপরের দোষই বর্ণনা করতে থাক তাহলে পরকালে আল্লাহও তোমার দোষ প্রকাশ করবেন’ (ইবনে মাজাহ : ২৫৪৬)।

রাসূল সা: এরশাদ করেন, ‘তোমরা অন্যের দোষ অন্বেষণ করবে না, গুপ্তচরবৃত্তি করবে না, পরস্পর কলহ করবে না, হিংসা-বিদ্বেষ করবে না’ (মুসলিম : ১৯০৩)। তবে কোনো ব্যক্তির অনিষ্ট থেকে ব্যক্তি, দেশ কিংবা জাতিকে বাঁচাতে গীবত করা অপরাধ নয়। ব্যক্তি এবং জাতিকে সচেতন করার উদ্দেশে তাদের দোষগুলো মানুষকে জানিয়ে দেয়া আবশ্যক। এক্ষেত্রে গীবত করা জায়েজ। পরিশেষে বলা যায় পরনিন্দা মানুষের ঈমান-আমলকে বিনষ্ট করে দেয়। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের এসব নিন্দনীয় কাজ থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন।

লেখক : মাদ্রাসা শিক্ষক