কবিতার কথা

Oct 26, 2019 04:34 pm
কবিতার কথা

 

মানব মনের বিচিত্র অনুভূতির ছন্দময় প্রকাশকে কবিতা বলা যায়। মানুষের অস্তিত্বের দুটি দিক- একটি দেহগত ও অন্যটি আত্মিক। অর্থাৎ একটি দৃশ্যমান অন্যটি অদৃশ্য- কবিতারও তেমনি দুটি দিক- একটি দৃশ্যমান, অন্যটি দৃষ্টির অগোচরে থাকে, মন বা অনুভূতি দিয়ে তা অনুভব করতে হয়। একটিকে বলা যায় কবিতার আত্মা, অন্যটিকে কবিতার শরীর। মনের ভাব ও অনুভূতিকে যদি কবিতার আত্মা বলি, তাহলে সেগুলোকে প্রকাশের জন্য যে শব্দরাজি ব্যবহৃত হয়, সেগুলোকে বলা যায় কবিতার শরীর। শব্দের নিপুণ বিন্যাসে ও আভরণে কবিতা বিচিত্র বৈভবে চিত্তাকর্ষক হয়ে ওঠে। তাই কবিতা পাঠে পাঠকের মনে আনন্দানুভূতির শিহরণ জাগে।

কবিতা যথার্থ কবিতা হওয়ার পেছনে আরো কয়েকটি উপাদান বা অনুষঙ্গ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হলো- ছন্দ, শব্দালঙ্কার, রূপক-উপমা-প্রতীক-রূপকল্প ইত্যাদি। এ সবের সমন্বিত, সুসঙ্গত ও কুশলী ব্যবহারে কবিতা যথার্থ কবিতা হয়ে ওঠে। এ ধরনের কবিতা অনেক সময় এতটাই শিল্পোত্তীর্ণ হয়ে ওঠে যে, তখন এগুলোকে অনায়াসে কবিতার শিল্প বলা যায়। তবে সব কবিতাই শিল্প নয়, কোনো কোনো কবিতা যথার্থ শিল্প হয়ে ওঠে। শিল্পী যেমন রঙ-তুলি ব্যবহার করে আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে বর্ণময়, চিত্রময়, সৌন্দর্যময় বিচিত্র ভুবন নির্মাণ করেন, কবিও তেমনি শব্দের কারুকাজ করে কবিতার পুষ্পিত ভুবন তৈরি করেন। শব্দের কারুকাজে থাকে ছন্দের অনিন্দ্য ব্যবহার, রূপক-উপমা-রূপকল্পের মাধুর্যময় অতুলনীয় ব্যতিক্রমী আভরণ।

মনের ভাব একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। এর সাথে কবির ব্যক্তি-জীবন, পারিপার্শ্বিক অবস্থা, অভিজ্ঞতা-অভিজ্ঞান ও অনুভূতির অবিভাজ্য সম্পর্ক বিদ্যমান। সর্বোপরি, মনের ভাব শরতের আকাশের মতোই ক্ষণে ক্ষণে রং বদলায়। তাই কবিতায় কবি-মনের যে ভাবের প্রকাশ ঘটে, তা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বিশেষ মুহূর্তের ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রকাশ। রোমান্টিক কবিদের ক্ষেত্রে এটা বিশেষভাবে প্রযোজ্য। অবশ্য কখনো কখনো এর ব্যতিক্রমও পরিলক্ষিত হয়। তবে তা একান্তই দুর্লভ। ক্লাসিক অর্থাৎ ধ্র“পদ কবিদের প্রকাশ-বেদনার মধ্যে ব্যক্তি-অনুভূতির সাথে সামষ্টিক বা জাতিগত অনুভব-অনুভূতির প্রকাশ অনেকটা অনিবার্য। মহাকাব্য রচয়িতা বা মহাকবিদের ক্ষেত্রে এ ধরনের অনুভূতি বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

কবিতার নির্দিষ্ট কোনো বিষয় নেই। যেকোনো বিষয়ই কবিতার উপজীব্য হতে পারে। ব্যক্তিগত, সামাজিক, ধর্মীয়, জাতিগত, অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ, দেশীয়-আন্তর্জাতিক, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক, প্রেম-বিরহ, আনন্দ-ভালোবাসা, নৈসর্গিক বিষয় ইত্যাদি সবকিছুই কবিতার বিষয়বস্তু হতে পারে। অবশ্য তা প্রকাশের ক্ষেত্রে যথার্থ কবিতা পদবাচ্য হওয়া বাঞ্ছনীয়। যেকোনো বিষয় নিয়েই লেখা হোক না কেন, শিল্পের বিচারে যথার্থ কবিতা বিবেচিত হলেই কেবল তা কবিতা বলে গণ্য হয়। মনে রাখতে হবে যে, কবিতায় বিষয়ের চেয়ে ভাবের গুরুত্ব অধিক এবং তা ছন্দময়, লালিত্যময়, চিত্র-বর্ণে দীপ্তিমান নক্ষত্ররাজির মত স্নিগ্ধ সমুজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

কবিতার মতো প্রবন্ধের বিষয়বস্তুও বিচিত্র। তবে দু’টির মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। প্রবন্ধের বিষয়বস্তু মানুষের মননশীলতা-বিচার-বুদ্ধি ও বিবেককে নাড়া দেয়, অন্য দিকে কবিতা মানুষের হৃদয় ও চিত্তবৃত্তিকে আলোড়িত-উদ্বোধিত করে। একটিকে বুদ্ধি দিয়ে, অন্যটি হৃদয় দিয়ে অনুভব করার বিষয়। একটির ভাষা ঋজু, অন্যটির ভাষা ইঙ্গিতময়, ছন্দময়, মাধুর্যময়।

শব্দকে কবিতার শরীর বলা হয়। সুনির্বাচিত শব্দের সুপ্রযুক্ত বিন্যাসেই সার্থক কবিতার সৃষ্টি। এখানে কবির যেমন স্বাধীনতা আছে, আবার তেমনি যথার্থ মুন্সিয়ানার পরিচয় বিধৃত হওয়ার পর্যাপ্ত অবকাশও রয়েছে। কবিরা শব্দ নিয়ে খেলা করেন, শব্দকে কখনো ভেঙে, কখনো যুক্ত করে, কখনো তার সাথে নানা অনুপ্রাস-অলঙ্কার যুক্ত করে সুরে-ছন্দে ভরে তা অপরূপ লালিত্যে মাধূর্যময় করে তোলেন। এ ক্ষেত্রে যে যত বেশি নৈপুণ্য বা মুন্সিয়ানার পরিচয় দিতে পারেন, তিনি ততটাই স্বার্থক।
কোনো ভাষায়ই প্রতিদিন নতুন নতুন শব্দ সৃষ্টি হয় না। ক্ষেত্রবিশেষে কালেভদ্রে দু’একটি নতুন শব্দের সৃষ্টি হয়। ব্যতিক্রমী প্রতিভার অধিকারী সৃজনশীল কোনো কোনো ব্যক্তি সজ্ঞানে দু’একটি নতুন শব্দ সৃষ্টি করেন। কিন্তু তা স্বীকৃতি পায় বা অভিধানে স্থান লাভ করে তখন যখন সাধারণভাবে তা ব্যাপকভাবে গৃহীত বা ব্যবহৃত হয়। তবে সচরাচর নতুন শব্দের সৃষ্টি না হলেও প্রচলিত শব্দের ব্যবহারে বৈচিত্র্য ও তার অর্থ ও ব্যঞ্জনায় অনেক সময় পরিবর্তন ঘটে। তা ছাড়া, প্রতিদিনকার ব্যবহৃত, অর্থবহ, পরিচিত শব্দমালা প্রতিভাবান কবির হাতে তাঁর নিপুণ কারুহস্তের জাদুস্পর্শে প্রায়ই পরিবর্তিত অর্থ ও অভিব্যঞ্জনা লাভ করে। এ জন্য কবিতাকে অনেকে ‘শব্দের শিল্প’ বলে অভিহিত করে থাকেন।

কবিরা প্রয়োজন, নিজস্ব রুচি ও পছন্দ অনুযায়ী প্রচলিত-অপ্রচলিত, নতুন-পুরাতন, সাধু-চলতি ইত্যাদি সব ধরনের শব্দই ব্যবহার করে থাকেন। শব্দ-নির্বাচন ও ব্যবহারে প্রত্যেকের নিজস্বতার ছাপ থাকে। প্রকৃতপক্ষে, শব্দ-ব্যবহারে যে কবি অধিক স্বাতন্ত্র্য ও নিজস্বতার পরিচয় দিতে সক্ষম, সে কবিকে ততটাই মৌলিকত্বের অধিকারী বলে মনে করা হয়। তাই যথার্থ কবিরা শব্দ নির্বাচনে যেমন সচেতন হন, শব্দ-ব্যবহারেও তেমনি নৈপুণ্য প্রদর্শনে সচেষ্ট হন। অনেক সময় স্বকীয় ভাষা ব্যবহারের কারণে কবির নিজস্বতা ও স্বাতন্ত্র্য নিরূপিত হয়। তাই নিজস্ব কবি-ভাষা নির্মাণে যে কবি যত বেশি সফল, তিনি কবি হিসেবে ততটাই স্বার্থক বলে বিবেচিত হন।

ইতিহাসের বিবর্তনে ভাষার রূপ বদলায়। ভাষার রূপ পরিবর্তিত হয় নতুন শব্দ গ্রহণ, পুরনো শব্দ বর্জন অথবা অন্য ভাষার সংস্পর্শে সে ভাষার শব্দ স্বীকরণের মাধ্যমে। শব্দের সমষ্টিই ভাষা। তাই ভাষার পরিবর্তন মূলত শব্দেরই পরিবর্তন। বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন চর্যাপদের ভাষার সাথে বর্তমান বাংলা ভাষার বিস্তর পার্থক্য। চর্যাপদের ভাষা বাংলা ভাষার সৃজ্যমান কালের ভাষা এবং সে ভাষা মূলত দেশী শব্দের সমন্বয়ে সৃষ্ট। পরবর্তীকালে বাংলা ভাষায় প্রচলিত দেশী শব্দের সাথে আরবি, ফারসি, তুর্কি, সংস্কৃত, ইংরেজি, ফরাসি, ওলন্দাজ ইত্যাদি বিভিন্ন ভাষার অসংখ্য শব্দের সংমিশ্রণ ঘটেছে। এ সবগুলোই বিদেশী বা ভিন্ন ভাষার শব্দ। কিন্তু সেসব শব্দ বাংলা ভাষার সাথে এমনভাবে মিশে গেছে এবং সাধারণভাবে তা এত ব্যাপকভাবে প্রচলিত ও ব্যবহৃত যে এখন আর সেগুলোকে বিদেশী বা ভিন্ন ভাষার শব্দ বলে বরখাস্ত করার উপায় নেই। এসব শব্দে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধ হয়েছে। ‘বিদেশী’ বা ভিন্ন ভাষার শব্দ বলে এগুলোকে বিতাড়িত করলে বাংলা ভাষার অস্তিত্বই বিপন্ন হবে। কালের যাত্রাপথে বিভিন্নভাবে বিভিন্ন প্রয়োজনে ও প্রেক্ষাপটে সেসব শব্দ বাংলা ভাষায় অবিমিশ্র হয়ে পড়েছে। সেগুলো এখন বাংলা ভাষারই অপরিহার্য সম্পদ হিসেবে গণ্য।

তবে জোর-জবরদস্তি করে কোনো ভিন্ন ভাষার শব্দকে ব্যবহার ও প্রচলন করা যায় না। জনগণের গ্রহণযোগ্যতা ও বোধগম্যতাই এ ক্ষেত্রে শেষ কথা। ইতঃপূর্বে দেখা গেছে, ভাবাবেগপ্রসূত হয়ে ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের ব্রাহ্মণ সংস্কৃত পণ্ডিত দুর্বোধ্য ও কঠিন সব সংস্কৃত শব্দ বাংলা ভাষায় প্রচলনের চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত তা সর্বজনগ্রাহ্য হয়নি। ভাষার চলমান ধারার সাথে তা স্বভাবতই খাপ খেয়ে চলতে পারেনি। এটাকে সর্বজন শ্রদ্ধেয় পণ্ডিত ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছেন ভাষার গণতন্ত্রায়ন। পানির গতি যেমন নি¤œমুখী, ভাষার গ্রহণ-বর্জনও তেমনি গণমানুষের গ্রাহ্যতার ওপর নির্ভরশীল। আর এ কথা সর্বসম্মত যে, সহজ-সরল ভাষা বা শব্দই গণমানুষের কাছে গ্রাহ্য। কবিরা সাধারণত ব্যক্তি-মনের অভিব্যক্তি ঘটাতে গিয়ে সাধারণের মনের কথাই প্রকাশ করে থাকেন। এ ক্ষেত্রে যে কবি যত বেশি সাধারণের কথা নিজের মতো করে প্রকাশ করতে সমর্থ, সে কবি তত বেশি জনপ্রিয়।

যথার্থ কবিরা মানব জীবনের স্বার্থকতা-ব্যর্থতা, দুঃখ-ব্যথা, প্রেম-বিরহ ইত্যাদি মানবিক অনুভূতি ও সংবেদনাকে সহজ-সরল ভাষায় শৈল্পিক আদলে অসাধারণ করে তুলে ধরার প্রয়াস পান। তাই এটা স্বতঃসিদ্ধ যে, বেশির ভাগ কবিই কবিতায় সহজ-সরল ও বোধ্যগম্য শব্দ নির্বাচনে সচেষ্ট হন। তবে এখানেও ব্যতিক্রম রয়েছে। অনেক কবিই কবিতায় কঠিন, দুর্জ্ঞেয় ও অপ্রচলিত শব্দ ব্যবহার করে থাকেন। এটা তাঁরা সজ্ঞানে ও সযতেœই করে থাকেন এবং অনেকেই বিশেষত অসাধারণ প্রতিভাধর কবিরা এতে সফল হন। দৃষ্টান্তস্বরূপ মাইকেল মধুসূদন দত্ত, কাজী নজরুল ইসলাম, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, ফররুখ আহমদের নাম উল্লেখ করা যায়। তাঁরা একাধারে কঠিন, দুর্বোধ্য ও অপ্রচলিত এমনকি ভিন্ন ভাষা অর্থাৎ সংস্কৃত, আরবি, ফারসি, উর্দু ইত্যাদি ভাষার অসংখ্য শব্দ অবলীলায় তাঁদের কাব্য-কবিতায় ব্যবহার করেছেন এবং প্রত্যেকেই ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছেন। বলা বাহুল্য, উপরোক্তদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে অনেকেই ব্যর্থ হয়েছেন বা উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জনে সক্ষম হননি। তাই বলা যায়, সরল-সহজ অথবা কঠিন-জটিল-অপ্রচলিত বা ভিন্ন ভাষার শব্দ ব্যবহার একমাত্র ও প্রধান বিচার্য্য বিষয় নয়, শব্দ ব্যবহারে নৈপুণ্য, সুসঙ্গতি ও কাব্যিক ব্যঞ্জনা সৃষ্টির ক্ষমতাই বড় কথা।

কবিতায় শব্দের ব্যবহার ও গুরুত্ব যেমন অপরিহার্য ও অবশ্যম্ভাবী তেমনি ছন্দ, শব্দালঙ্কার, সমাসোক্তি, উপমা-প্রতীক-রূপক-রূপকল্প ইত্যাদির ব্যবহারও পরিলক্ষিত হয়। মজার কথা হলো এই, শব্দকে ভেঙেচুরে, তার কারুময় কুশলী বিন্যাসেই এসবের সৃষ্টি। এ ক্ষেত্রে প্রত্যেক কবিই তাঁর স্বকীয় দৃষ্টিভঙ্গী, রুচি ও দক্ষতার পরিচয় দিয়ে থাকেন। এ দক্ষতা প্রদর্শনের ওপরই কবির স্বীকৃতি ও কবি-কর্মের সাফল্য নির্ভরশীল। এ দক্ষতা প্রদর্শনের ওপরই কবির স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্যও নিরূপিত হয়। একজন আরেকজন থেকে আলাদা, একজনের ওপর অন্যজনের শ্রেষ্ঠত্ব বিচার করা হয় এ স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্যের মানদণ্ডেই। তাই শব্দ-চয়নে ও শব্দের সুপ্রযুক্ত ব্যবহারে যেমন, তেমনি ছন্দ, শব্দালঙ্কার, সমাসোক্তি, উপমা-প্রতীক-রূপক-রূপকল্পের কুশলী ব্যবহারে প্রত্যেক কবির সযতœ প্রয়াস ও স্বাতন্ত্র্য সৃষ্টির প্রয়াস পরিলক্ষিত হয়। এ জন্য যথার্থ কবিরা ছন্দ নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন, পুরনো ছন্দের অভিনব ব্যবহার, কখনো কখনো নতুন ছন্দের উদ্ভাবন করেন। আধুনিক অনেক কবি কবিতায় ছন্দ ব্যবহারে উদাসীন বলে অনেকের অভিযোগ। কথাটা হয়তো এভাবে বলা সঙ্গত যে, অনেক কবিতায় প্রচলিত বা নির্দিষ্ট কোনো ছন্দের উপস্থিতি লক্ষযোগ্য নয়। এ প্রসঙ্গে গুরুত্বসহকারে বলা যায় যে, কবিতায় ছন্দের উপস্থিতি অপরিহার্য। তবে তা সর্বদা প্রচলিত বা সুনির্দিষ্ট ছন্দ-রীতি মেনে নাও চলতে পারে। কবিতায় ছন্দের অনুপস্থিতি কবিতার মাধুর্য ও গ্রহণযোগ্যতাকেই ম্লান করে দেয়।

কবিতায় শব্দালঙ্কার ও সমাসোক্তির ব্যবহার অপরিহার্য নয়, তবে তা রূপসী রমণীর সাধারণ গাত্রাবরণের ওপর চাকচিক্যময় অলঙ্কারের মতোই উজ্জ্বল ও চিত্তাকর্ষক। অবশ্য মনে রাখতে হবে, অনাবশ্যক ও বাহুল্য অলঙ্কার ব্যবহারে নারীর স্বাভাবিক রূপ-সৌন্দর্য শুধু ঢাকাই পড়ে না, অনেক সময় তা উৎকট বা বিসদৃশ্যও দেখায়। অনুরূপভাবে কবিতায় স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত শব্দালঙ্কার ও সমাসোক্তির ব্যবহারই অভিপ্রেত। তবে পুনরুল্লেখ করা প্রয়োজন যে, শব্দালঙ্কার ও সমাসোক্তি ছাড়াও দক্ষ কবির হাতে সফল কবিতা রচনা সম্ভব। অক্ষম কবিরা অনেক সময় এসবের অনাবশ্যক ও মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারে কবিতার সাধারণ সৌন্দর্য ও আকর্ষণ বিনষ্ট করে ফেলেন। এটাকে এক ধরনের ঙনংবংংরড়হ বলা যায়, যে সম্পর্কে সচেতন থাকা আবশ্যক।

কবিতায় প্রতীক-উপমা-রূপক-রূপকল্প ব্যবহারও অপরিহার্য নয়। এগুলোর ব্যবহার ছাড়াই উৎকৃষ্ট কবিতা রচনা সম্ভব তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল পুরস্কার-বিজয়ী অমর কাব্য ‘গীতাঞ্জলি’। তা সত্ত্বেও আদিকাল থেকে পৃথিবীর তাবৎ সাহিত্যে এগুলোর ব্যবহার চলে আসছে। বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদেও এর ব্যবহার পরিদৃষ্ট হয়। মধ্যযুগে এবং আধুনিক যুগেও এর ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়।

আধুনিক যুগে বরং এর ব্যবহার অনেক তাৎপর্যময় হয়ে উঠেছে। মধুসূদন ব্যাপকভাবে এর ব্যবহার করেছেন। দু’একটি ব্যতিক্রম ছায়া রবীন্দ্রনাথও তাঁর অন্যসব কাব্যে এর অজস্র ব্যবহার করেছেন। আধুনিক যুগের প্রায় সব কবিই এগুলোর ব্যবহারে অধিকতর যতœবান ও অভিনবত্ব প্রদর্শনে সচেষ্ট। তিরিশোত্তর যুগের কবিরা বিশেষত জীবনানন্দ দাশ প্রতীক-উপমা-রূপক-রূপকল্পের ব্যবহারে সর্বাধিক কৃতিত্ব প্রদর্শন করেন। আধুনিক ইংরেজ কবিদের আদর্শে তাঁরা এ ক্ষেত্রে ভিন্ন ও অভিনব মাত্রা সংযোজন করেন। তিরিশের ভিন্নধারার কবি জসীমউদ্দীন ও চল্লিশ দশকের কবি ফররুখ আহমদও উপমা-প্রতীক-রূপক-রূপকল্পের ব্যবহারে অভিনবত্ব ও স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের ছাপ রেখেছেন। পঞ্চাশ দশকের কবি আল মাহমুদও এ ক্ষেত্রে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ষাটের দশকে ইউরোপে বিশেষত ফ্রান্সে কবিতা ও শিল্পকর্মের অন্যান্য ক্ষেত্রে পরাবাস্তবতার উদ্ভব ঘটে। বাংলা কবিতায়ও তার প্রভাব পড়ে। এ ক্ষেত্রে এ সময়কার উল্লেখযোগ্য কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ বিশেষভাবে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

প্রতীক-উপমা-রূপক-রূপকল্প কবিতার ভাষাকে শাণিত করে, ভাব ও বিষয়কে সুস্পষ্ট করে ও অতিরিক্ত ব্যঞ্জনা সৃষ্টির মাধ্যমে পাঠকের মনে প্রগাঢ় অনুরণন সৃষ্টি করে। তাই আধুনিক কবিতায় এসবের ব্যবহার বিশেষ তাৎপর্যে উদ্ভাসিত। যে কবি এসবের ব্যবহারে যত বেশি অভিনবত্ব ও পারদর্শিতা প্রদর্শন করেন, সে কবি তত বেশি উজ্জ্বলভাবে পাঠকের দৃষ্টিতে ধরা দেন। এটা কবি হিসেবে তার বৈশিষ্ট্য ও সাফল্যেরও মাপকাঠি রূপে গণ্য হয়ে থাকে।

প্রতীক-উপমা-রূপক-রূপকল্পকে সাধারণত তিন ভাগে ভাগ করা যায়- নিসর্গ বা প্রকৃতিসঞ্জাত, ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পৃক্ত এবং বুদ্ধিজাত। কোনো কবি হয়তো নিসর্গ বা প্রকৃতিসঞ্জাত, কোনো কবি হয়তো ইতিহাস-ঐতিহ্যাশ্রয়ী, আবার কোনো কবি হয়তো বুদ্ধিজাত উপমা-রূপক-রূপকল্প ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। আবার কোনো কবি হয়তো একসাথে একাধিক ধরনের উপমা-রূপক-রূপকল্প ব্যবহারে পারঙ্গমতা প্রদর্শন করেন। তবে যে কবি যেভাবেই এর ব্যবহার করুন না কেন, এসবের ব্যবহারে যিনি যত বেশি অভিনবত্ব ও স্বকীয়তার স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম, সে কবি তত বেশি কৃতিত্বের অধিকারী।

উপরে আলোচিত কবিতার বিভিন্ন উপাদান বা অনুষঙ্গের সুসমঞ্জস ও সুসঙ্গত ব্যবহারে যথার্থ কবিতার সৃষ্টি। অবশ্য এ কথা ঠিক যে, বাধাধরা কোনো নিয়ম মেনে কবিতা রচিত হয় না। কবিতা মূলত কবির স্বাধীন ও স্বতঃস্ফূর্ত মনের অভিব্যক্তি। সর্বোপরি, কবির মনের উদ্দীপ্ত ভাব ও কল্পনার প্রকাশই কবিতা। স্বপ্ন ও বাস্তবতার অনুভূতিগ্রাহ্য, হৃদয়-সংবেদী শিল্পিত বর্ণ-বিন্যাসই কবিতা। পাঠকের মনকে আবিষ্ট করা, স্বপ্ন-কল্পনার অতীন্দ্রিয় জগতের সিংহদ্বারে পৌঁছে দেয়াই কবির লক্ষ্য। সে লক্ষ্য পূরণে কবি কতটা সফল সেটাই আসল বিচার্য বিষয়। সর্বোপরি, পাঠকের মনে একটি আনন্দের অনুভূতি সৃষ্টি করাই কবির প্রধান লক্ষ্য। তবে সে আনন্দের অনুভূতি যে সব সময় সুখানুভূতি তাও নয়, অনেক সময় নিদারুণ বিষাদ, গভীরতর বেদনা ও অতৃপ্তির দুঃখবোধ থেকেও এক ধরনের আনন্দের সৃষ্টি হয়। ইংরেজ কবি পিবি শেলী যেমন বলেছেন- ‘Our sweetest songs are those that tell of saddest thought’- অর্থাৎ গভীরতর বেদনানুভূতির মধ্যেই মধুরতম সঙ্গীতের সৃষ্টি।