মিয়ানমারের নেপথ্য ইতিহাস

হান্সদা সুভেন্দ্র শেখর | Mar 04, 2020 10:25 pm
মিয়ানমারের নেপথ্য ইতিহাস

মিয়ানমারের নেপথ্য ইতিহাস - সংগৃহীত

 

ইগুয়েন লরেন্সের প্রথম উপন্যাস দি ল্যাকুয়ার্ড কার্টন অব বার্মা আংশিকভাবে একটি সংখ্যালঘু পরিবারের জীবন নিয়ে লেখা। ভদ্রলোক ছিলেন মালয়ালি ও তার স্ত্রী কারেন তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ বার্মায় দিন গুজরান এবং নির্যাতনকারী জান্তা ক্ষমতা গ্রহন করার পর তাদের ভারতে পলায়নের কাহিনী নিয়ে এই উপন্যাস। বৃহত্তর দিক থেকে এই উপন্যাস বার্মা তথা মিয়ানমারের ইতিহাস ও রাজনীতির একটি ভাষ্য।

দি জেনারেল নামের দীর্ঘ একটি অধ্যায়ে ধাপে ধাপে বর্ণনা করা হয়েছে কিভাবে জান্তা জনগণের স্বাধীনতা ও জীবন কেড়ে নিচ্ছে। বৌদ্ধ দেশ হওয়ায় বার্মায় গরুকে বিবেচনা করা হয় পবিত্র প্রাণী হিসেবে, কালো গোশত বিবেচনা করে এর গোশত খাওয়া থেকে বিরত থাকা হয়। প্রধানমন্ত্রী উ নুর আমলে তা নিষিদ্ধ ছিল। অবশ্য ১৯৬০-এর দশকের প্রথমার্ধে জান্তার শাসনকালে গরুর গোশত রেঙ্গুনের বাজারে প্রকাশ্যে বিক্রি হতো। যারা এই গোশত খেত, তাদের মধ্যে বেশ ফুর্তির ভাব ছিল।

এতে অবাক হওয়ার কিছু ছিল না, এ নিয়ে জনসাধারণের মধ্যে তেমন ক্ষোভও ছিল না। লোকজন পুষ্টির সস্তা উৎস সহজে প্রাপ্তিযোগ্য হওয়ায় খুশিই ছিল। তাদের কাছে প্রথম বড় ধরনের ধাক্কা লাগে সৈন্যরা যখন বেওয়ারিশ কুকুরগুলোকে গুলি করে ও বিষ দিয়ে হত্যা করতে শুরু করে। দৃশ্যত রেঙ্গুনকে পরিচ্ছন্ন নগরী হিসেবে গড়ার জন্য এই উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। অবশ্য লোকজন অল্প সময়ের মধ্যে এই ধাক্কা কাটিয়ে ওঠে স্বাভাবিক জীবনযাপন শুরু করে।
তৃতীয় ধাক্কা আসে ভিক্ষুক ও কুষ্ঠু রোগে আক্রান্তদের ‘আধুনিক ও ফ্যাশনদুরস্ত’ শপিং এলাকাগুলো থেকে তাড়িয়ে দেয়া শুরু হলে। অনেক সময় তাদেরকে বিষাক্ত ইনজেকশন দিয়ে হত্যা করে গণকবরও দেয়া হতো।
অবস্থা চূড়ান্ত পর্যায়ে উঠে আসে জান্তার বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণকারী রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ওপর গুলিবর্ষণ করার ঘটনায়।
বিক্ষোভরত ছাত্রদের লাশ তাদের মা-বাবার কাছে হস্তান্তর না করে অচিহ্নিত কবরে চাপা দেয়া হয়। ছাত্রদের স্বপ্ন অচেনা কবরে মারা পড়ে। ভারতীয় ও চীনাদের মালিকানায় থাকা ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের পর সামরিক বাহিনী স্কুলগুলোর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে জান্তার সমাজতন্ত্রবাদ ও মূল্যবোধের আলোকে ছাত্র ও শিক্ষকদের একটি প্রজন্ম গঠন করার জন্য।

তখন ও এখন
এর মাধ্যমেই আদর্শ দেশ বানানো বা পরিশুদ্ধ দেশ বানানোর ঘটনা ঘটেনি। এর সূচনা হয় ক্ষমতা গ্রহণ করা ও তারপর ধীরে ধীরে জনসাধারণের অধিকার ও স্বাধীনতা দমন করার ক্ষমতা প্রয়োগ করার মধ্য দিয়ে। এই সময়টাতে জনসাধারণ হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে যায়, যখন প্রয়োজন ছিল, তখন তারা তাদের কণ্ঠ উচ্চকিত করেনি।
দি ল্যাকুয়ার্ড কার্টন অব বার্মা একটি সময়ের প্রেক্ষাপটে লেখা হলেও এখনো এটি প্রাসঙ্গিক। কারণ বিষয়বস্তু একই রয়ে গেছে। তাছাড়া এতে অনেক তথ্য রয়েছে। বইটি শুরু হয়েছে ১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে আং সানের হত্যাকাণ্ড দিয়ে এবং শেষ হয়েছে আং সান সু চির ২০১৭ সালের বক্তব্য দিয়ে।

এই উপন্যাসের নায়কের নাম ইমানুয়েল ডেভিড। তিনি জাতিগতভাবে মালয়ালি, বর্তমান ভারতের কেরালার কালিকট থেকে সেখানে গিয়েছিলেন। উচ্চাকাঙ্ক্ষী এই গায়ক সিঙ্গাপুর ও মালয় হয়ে বার্মায় গিয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন মিউজিকে ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার সাথে সাথেই মিউজিকের ভবিষ্যত ভালো না হওয়ায় তাকে অনেক নিম্নমানের কাজ করতে হয়। তবে শেষ পর্যন্ত ডেভিডেরি পরিচয় হয় অভিযাত্রী হিসেবে (জাপান সেনাবাহিনীর এক ক্যাপ্টেনের ভাষায়)। আসলে তিনি ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির অযোদ্ধা ইউনিটের ক্যাপ্টেন হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছিলেন।

বার্মার একটি গ্রামে ব্রিটিশদের কাছে আত্মসমর্পণের পর ডেভিড নতুন জীবন শুরু করেন ডোরাকে বিয়ে করে। তার স্ত্রী ছিলেন দেশটির দক্ষিণাঞ্চল থেকে আসা নারী। তারা পরিবার শুরু করেন। শ্বেতাঙ্গ কারেনরা হলো বার্মার অনেক সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর একটি। বার্মা স্বাধীন হওয়ার সময়টাতে ব্রিটিশ উপনিবেশ জয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও এরপরই জাপানি দখলদারিত্ব কচিন, লাল করেন, শান, ও শ্বেত কারেনদের বিচ্ছিন্নতার অবসান ঘটিয়ে দেয়। তাদের তাৎপর্য ও গুরুত্ব ফুটে ওঠে। আং সান বুঝতে পারলেন যে জাতীয় ফোরামে এসব লোকের স্বার্থ সুরক্ষিত না হলে এর বেশির ভাগ সীমান্তই বৈরী থাকবে।

লরেন্স বার্মার বহু সাংস্কৃতিক সমাজের অন্তঃদৃষ্টি তুলে ধরেছেন। তিনি ডোরা ও পরিবারের মাধ্যমে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সাথে আমাদেরকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। এমনকি একটি গ্রাম থেকে ডেভিডের একটি ছাগল কেনা এবং ডোরাদের গ্রাম কিভাবে খ্রিস্টান হলো, এসব কাহিনী দিয়ে তাদের জীবনযাত্রা সম্পর্কেও আলোকপাত করেছেন।
তাছাড়া তিনি জেনারেল আঙ সান, কারেন ন্যাশনাল ইউনিয়ন, জেনারেল নে উইন, আং সান সু চি, ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসির মতো বিষয়গুলোর মাধ্যমে বার্মার রাজনীতিও পাঠকদের সামনে সাবলীলভাবে তুলে ধরেছেন। এমনকি রোহিঙ্গা সঙ্কটও বাদ পড়েনি।

লরেন্সর উপন্যাসটি উচ্চাভিলাষী ও গভীরভাবে রাজনৈতিক। বার্মার রাজনীতি এতে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে আছে।
উপন্যাসটির জন্য লরেন্স প্রশংসা পেতে পারেন। তিনি বেশ দক্ষতার সাথেই ব্যক্তিজীবন ও রাজনীতিকে একটি তথ্যমূলক রচনার মধ্যে নিয়ে এসেছেন।

স্ক্রল.ইন


 

ko cuce /div>

দৈনিক নয়াদিগন্তের মাসিক প্রকাশনা

সম্পাদক: আলমগীর মহিউদ্দিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: সালাহউদ্দিন বাবর
বার্তা সম্পাদক: মাসুমুর রহমান খলিলী


Email: [email protected]

যোগাযোগ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।  ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Follow Us