ইসলামের জাকাত ও কর ব্যবস্থা

Jul 27, 2019 02:58 pm
ইসলামের জাকাত ও কর ব্যবস্থা

 

ইসলামের জাকাত ও কর ব্যবস্থা -
১. জাকাত এবং কর : ধারণাগত পার্থক্য : শাব্দিক অর্থে ‘জাকাত’ হলো এমন একটি বিষয়, যা ক্রমাগত আরো বৃদ্ধি পায়। আরবি শব্দের অর্থসংক্রান্ত গ্রন্থ লিসানুল আরবে ‘জাকাত’ শব্দের অর্থ উল্লেখ করা হয়েছে, পরিচ্ছন্নতা, ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়া, অতিরিক্ত, প্রশংসা ইত্যাদি। আর শরিয়াহর পরিভাষায় জাকাত হলো- সম্পদের সেই অংশ, যা প্রদান করাকে আল্লাহ এবং তার রাসূল সা: বাধ্যতামূলক করে দিয়েছেন। একইভাবে, সম্পদের নির্ধারিত অংশ যথাযথ প্রাপ্য ব্যক্তিদেরকে পৌঁছে দেয়াকেও জাকাত বলা হয়।

২. সম্পদের নির্দিষ্ট পরিমাণ বিলিয়ে দেয়াকে জাকাত বলা হয়। কেননা আমলটি জাকাত দানকারীর মন ও অন্তরকে পরিচ্ছন্ন করে, তার সম্পদকেও পবিত্র করে (চূড়ান্ত আর্থিক বিশ্লেষণেও এমনটাই প্রমাণ হয়)। একই সাথে, অভাবী মানুষেরাও জাকাত পেয়ে সমৃদ্ধ হন; কেননা তারা তাদের উপকারে লাগে এমন কিছু সম্পদ তখন হাতে পান। এতে জাকাতপ্রাপ্ত ব্যক্তির মন সন্তুষ্টিতে ভরে ওঠে এবং মানসিকভাবেও তিনি সমৃদ্ধ হন।
৩. অন্য দিকে, ‘কর’ হলো রাষ্ট্র কর্তৃক জনগণের ওপর আরোপিত একটা দায়িত্ব। সরকার পরিচালনার জন্য, সরকারের ব্যয় নির্বাহ করার জন্য করের প্রয়োজন। দীর্ঘ দিন ধরেই সরকারগুলো তার রাজস্ব আয় বৃদ্ধি করার জন্য করারোপ করে থাকে, যা দিয়ে প্রশাসন ও সামরিক কর্মকাণ্ডসহ রাষ্ট্রীয় কাজগুলো সম্পাদন করা হয়। আর যেসব দেশে সার্বভৌম রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রচলিত আছে, সেখানে রাজা ও রাজপরিবারের যাবতীয় খরচও এই করের অর্থ দিয়েই পূরণ করা হয়।
৪. বর্তমানে কর দিয়ে শুধু সামরিক বা প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডই পরিচালিত হয় না, বরং রাষ্ট্রের যাবতীয় সামাজিক এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও এই করের অর্থ দিয়েই বাস্তবায়ন করা হয়।


জাকাত ও করের মধ্যে সাদৃশ্য এবং বৈসাদৃশ্য :
জাকাত ও করের মধ্যে বেশ কতগুলো সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য বিদ্যমান। নিম্নে তা সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো।
সাদৃশ্য : ক) জাকাত করের মতো করেই আদায় করতে হয়। যার জাকাত দেয়ার সামর্থ্য আছে তিনি যদি স্বেচ্ছায় জাকাত দিতে না চান, তাহলে জোর করে হলেও জাকাত আদায় করার সুযোগ আছে। ঠিক তেমনটা করের ক্ষেত্রেও হয়। তবে এ নিয়ম সেখানেই প্রযোজ্য, যেখানে রাষ্ট্রই বাধ্যতামূলকভাবে জাকাত আদায় করে। আধুনিক সময়ে অবশ্য জাকাত আদায়প্রক্রিয়াকে সহজতর করার জন্য নানা ধরনের সহায়ক আইনও প্রণয়ন করা হয়েছে।

কুরআন এবং সুন্নাহ এটা পরিষ্কারভাবেই বলে দিয়েছে, ইসলামী রাষ্ট্র হলে রাষ্ট্রকেই দায়িত্ব নিয়ে জাকাত আদায় করতে হবে। এই দাবির সপক্ষে প্রমাণ হলো, প্রথম খলিফা হজরত আবুবকর রা: সেই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেন, যার মাধ্যমে তিনি জাকাত প্রদানে অস্বীকৃতি জ্ঞাপনকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। খ) ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাষ্ট্র যে জাকাত আদায় করবে, তাকে রাষ্ট্রীয় কোষাগারেই রাখতে হবে। তবে করের মতোই পৃথক অ্যাকাউন্টে (হিসাবে)। রাষ্ট্র জাকাতবিষয়ক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের (আমেলিনা আলাইহা) মাধ্যমে জাকাত আদায় করবে। তবে যদি বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে জাকাত আদায় করা হয়, তাহলে আদায়কৃত সেই অর্থ অন্য যেকোনো পাবলিক ফান্ড বা সাধারণ তহবিলের মতোই নিরাপদে সংরক্ষণ করতে হবে। গ) করের মতো জাকাত প্রদান করেও দাতা ব্যক্তি প্রত্যক্ষভাবে সমপরিমাণ কোনো আর্থিক সুবিধা পাবেন না। জাকাতের ক্ষেত্রে বিষয়টি পুরোই ভিন্ন। কেননা যিনি জাকাত দেন, তিনি পরকালীন চিরস্থায়ী জীবনে এর প্রতিদান আশা করেন। অন্য দিকে, যিনি কর দেন তিনি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কিছু সুবিধা বা আনুকূল্য পান, যদিও সরাসরি আর্থিক ফায়দা হিসেবে কিছু পাওয়ার সুযোগ তার নেই।
বৈসাদৃশ্য : (ক) জাকাত এবং করের মধ্যে বেশ কিছু তাৎপর্যপূর্ণ বৈসাদৃশ্যও রয়েছে। প্রাথমিকভাবে যদি বলতে হয়, জাকাত হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত একটি ইবাদত- যার মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি বান্দা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারে এবং সেই সাথে তাকওয়া অর্জন করতে পারে। কর কখনোই জাকাতের মতো কিছু নয়। কর হলো, সামাজিক দায়বদ্ধতার একটি অংশ, যার সাথে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়ার কিংবা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করার কোনো সম্পর্ক নেই। জাকাত হলো আল্লাহ ও তাঁর বান্দাহর মধ্যকার একটি লেনদেন, পক্ষান্তরে কর হলো রাষ্ট্রের সাথে নাগরিকের একটি বিনিময়।

(খ) জাকাতের মূল ভিত্তি হলো ‘নিসাব’। সম্পদের পরিমাণ নিসাবের সীমার চেয়ে কম হলে জাকাত দিতে হয় না। জাকাত থেকে পরিত্রাণ লাভের বিষয়টা আধুনিক সময়ের কর প্রক্রিয়ার সাথে মেলে না। করের ক্ষেত্রেও মওকুফ সুবিধা পাওয়ার সুযোগ আছে; তবে এটা তখনই হয় যখন সরকার বা কর বিভাগ সেই সুবিধা প্রদান করতে সম্মত হয়।
(গ) জাকাত হলো একটি স্থায়ী এবং নিয়মিত ব্যবস্থা। কেউ এই পদ্ধতিতে বা প্রক্রিয়াতে কোনো ধরনের পরিবর্তন আনতে পারবে না। অপরপক্ষে, কর হলো এমন একটি বিষয়, যা নিয়মিতভাবে পরিবর্তিত হতেই থাকে।
জাকাত ও করের লক্ষ্য এবং নিয়তেও পার্থক্য রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন, ‘তাদের সম্পত্তি থেকে জাকাত গ্রহণ করো, যাতে তুমি তাদের পবিত্র এবং বরকতময় করতে পারো। আর তুমি তাদের জন্য দোয়া করো, নিঃসন্দেহে তোমার দোয়া তাদের জন্য সান্ত্বনাস্বরূপ। বস্তুত আল্লাহ সব কিছুই শোনেন, জানেন।’ (সূরা আত তাওবাহ : আয়াত ১০৩)।

জাকাত দেয়ার পেছনে মূল নিয়ত হলো সম্পদকে পবিত্র করা (নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে) এবং মানুষের মনকে লোভ ও সম্পদ জমিয়ে রাখার মোহ থেকে মুক্ত করা। জাকাত আদায়ের উদ্দেশ্য এক দিকে যেমন আধ্যাত্মিক, অন্য দিকে অর্থনৈতিকও বটে। কিন্তু কর আদায়ের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণরূপে জাগতিক। কর দিয়ে কখনোই জাকাতের মতো নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্য পূরণ করা সম্ভব হবে না।
প্রাপ্ত অর্থের ব্যবহারের দিক থেকেও জাকাত এবং করের মধ্যে আরেকটি বড় পার্থক্য লুকিয়ে আছে। কর যেকোনো উদ্দেশ্যেই ব্যবহার করা যায়, কিন্তু জাকাতের অর্থ কতগুলো নির্দিষ্ট খাতেই ব্যবহার করা যায়, বিশেষত যার মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন করা, ঋণগ্রস্তকে ঋণের দায় থেকে মুক্ত করা, দাসত্ব থেকে কোনো ব্যক্তিকে স্বাধীন করা, মুসাফিরের প্রত্যাবর্তনকে সহজতর করা এবং মানুষের কল্যাণ সাধন করা (ফি সাবিলিল্লাহ) সম্ভব হবে।

জাকাতে অতিরিক্ত কর সংযোজন করার বৈধতা :
ইসলামের প্রথম যুগে ইসলামী ফকিহদের বিভিন্ন লেখনীতে জাকাতে অতিরিক্ত কর সংযোজনের বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও বর্তমান সময়ের ফকিহ ও ইসলামী অর্থনীতিবিদদের মধ্যে এজাতীয় কোনো মতপার্থক্য আর দেখা যায় না, বরং এ বিষয়ে এখন ঐকমত্যই সৃষ্টি হয়েছে বলা যায়। ইসলামী অর্থনীতিবিদ, ফকিহ এবং ফতোয়া সম্পর্কিত সাম্প্রতিক বইগুলো পাঠ করলে এ সত্যতাই পাওয়া যায়।
ড. ইউসুফ আল কারদাভী তার বিখ্যাত গ্রন্থ ফিকহ-উজ-জাকাতে (জাকাতের আইন) ইসলামী রাষ্ট্রের করারোপের পক্ষে বেশ কিছু যুক্তি তুলে ধরেছেন। যদি প্রয়োজন হয়, তাহলে প্রথমত, ‘ (জাকাত ছাড়া সম্পদের ওপর অন্য কোনো হক আছে কি না) শীর্ষক অধ্যায়ে বলা হয়েছে- অধিকাংশ অর্থনীতিবিদ এই বিষয়ে একমত হয়েছেন যে, মুসলমানদের ওপর যেকোনো প্রকৃত প্রয়োজনে জাকাতের বাইরেও কর আরোপ করা যাবে।

দ্বিতীয়ত, এমন কিছু প্রয়োজন বা চাহিদা আছে, যা শুধু জাকাতের অর্থ দিয়েই পূরণ করা যাবে না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, প্রশাসন ব্যবস্থাপনা, জাতীয় অবকাঠামো নির্মাণ প্রভৃতি। এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে হলে জাকাতের অতিরিক্ত আরো কর আরোপ করতে হবে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন, ‘ওয়াজিব (বাধ্যতামূলক) কোনো কাজকে সম্পাদন করতে যে অর্থ বা সম্পদের প্রয়োজন, তা দেয়াও ওয়াজিব।’
তৃতীয়ত, ফিকাহর একটি সাধারণ নীতি হলো, ভালো কিছু করার চেয়ে যদি বড় কোনো ক্ষতি থেকে বাঁচানো যায়, তাহলে সেই চেষ্টা করাই বরং শ্রেয়। যদি রাষ্ট্র পর্যাপ্ত সম্পদের অভাবে তার অর্থনৈতিক দায়িত্বগুলো সঠিকভাবে পালন করতে না পারে তাহলে এর ফলে জনমনে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হতে পারে, এমনকি নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়ে যেতে পারে। এ অবস্থায় রাষ্ট্রকে করারোপের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সম্পদ জোগাড় করে তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে যেতে হবে।

চতুর্থত, আল্লাহ ব্যক্তির সম্পদ ও জীবনকে কোরবানি করার মাধ্যমে জিহাদ করাকে বাধ্যতামূলক করে দিয়েছেন (‘জিহাদ’ মানে ইসলাম এবং ইসলামী ভূখণ্ডকে রক্ষা করার এবং যেকোনো ধরনের অত্যাচার, নিপীড়ন ও জুলুম বন্ধ করার লক্ষ্যে চেষ্টা করা)। এ দায়িত্বটি জাকাতের অতিরিক্ত দায়িত্ব। এই যুগে যদি বড় কোনো জিহাদ করতেই হয় তাহলে করারোপের মাধ্যমে সম্পদ বৃদ্ধি করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
আল কারদাভী আরো উল্লেখ করেছেন, জাকাতের অতিরিক্ত কর সংযোজন করার ব্যাপারে প্রমাণ হিসেবে যে হাদিসগুলো পাওয়া যায়, সেগুলো হয় দুর্বল, না হয় অস্পষ্ট। কিন্তু জাকাতের বাইরে খাজনা আদায়ের ব্যাপারে বরং কুরআন ও হাদিস থেকে বেশ শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়।

বর্তমান সময়ের চিন্তাবিদ ও গবেষকদের মধ্যে এ রকম ঐকমত্যও হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি অন্যান্য কর সঠিকভাবে প্রদান করে তা সত্ত্বেও জাকাত প্রদানের দায়িত্ব থেকে তিনি দায়মুক্ত হন না। জাকাত প্রদান করা বাধ্যতামূলক। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, পাকিস্তানের মুসলিম নাগরিকেরা যদি ইনকাম ট্যাক্স, সেলস ট্যাক্স বা আমদানি শুল্কের মতো সাধারণ করগুলো প্রদান করেন; তারপরও জাকাত এবং উশর অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে তাদের ওপর জাকাত প্রদান করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

বাংলাদেশেও জাকাত অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে এ নিয়মকে কার্যকর করা হয়েছে, যদিও জাকাত প্রদানের হার এখানে যথেষ্ট সন্তোষজনক। এই অর্ডিন্যান্স এবং সংশ্লিষ্ট বিধিবিধানের মাধ্যমে যেসব উপকরণের জন্য জাকাত দিতে হয়, সেগুলোকে নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সাথে নিসাব এবং সেই আলোকে জাকাতের হারও নিরূপণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের জাকাত সম্পর্কিত বিধানগুলোকে ‘সংযুক্তি-ক’তে সংযোজন করা হয়েছে। বাংলাদেশেও নিয়ম একই, কোনো নাগরিক জাকাত দেয়ার কারণে অন্যান্য সাধারণ কর থেকে তিনি মওকুফ পেয়ে যাবেন, এমনটি নয়।
জাকাত দিলে অন্য করগুলো না দেয়ার কোনো যুক্তি নেই। কেননা, জাকাত আর করের নিয়ত ও উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ আলাদা, যা ইতঃপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। সাধারণ রাজস্ব দিয়ে যে প্রয়োজনগুলো পূরণ করা হয় তা জাকাত দিয়ে পূরণ করা কখনোই সম্ভব হবে না।
ইসলামী রাষ্ট্রের সম্ভাব্য করগুলো : জাকাত পরিশোধ করার পরও ইসলামিক ব্যবস্থাপনার আলোকে একজন মানুষের ওপর কী কী করারোপ করা যাবে?
একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও প্রতিরক্ষা কার্যক্রম কিংবা সমাজকল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনায় যতটুকু রাজস্ব প্রয়োজন ইসলামী পদ্ধতির আওতায় ঠিক ততটুকু পরিমাণ রাজস্বই করের মাধ্যমে আদায় করা যাবে বলে আমি মনে করি।

সব ক্ষেত্রে অমুসলিমদের ওপর বিশেষ কোনো করারোপ করার প্রয়োজন নেই। যতক্ষণ পর্যন্ত একজন অমুসলিম ইনকাম ট্যাক্স, কাস্টম কর, ভ্যাট ও অন্যান্য কর নাগরিক দায়িত্বের অংশ হিসেবেই পরিশোধ করে যান, ততক্ষণ অবধি শুধু অমুসলিম হওয়ার কারণে তার ওপর বাড়তি কোনো বিশেষ কর আরোপ করার প্রয়োজন নেই। বর্তমানে ইরান, পাকিস্তান বা সৌদি আরবের মতো দেশগুলোর কর্তৃপক্ষও ভিন্ন কোনো নামে অমুসলিমদের ওপর বিশেষ কোনো করারোপ করা প্রয়োজন বলে মনে করছে না।
একই ধরনের মত দিয়েছেন বর্তমান সময়ের প্রসিদ্ধতম ইসলামিক ব্যক্তিত্ব ড. ইউসুফ আল কারদাভী। এ প্রসঙ্গে তিনি দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর বিন খাত্তাবের উদাহরণ টেনে বলেছেন, খলিফা উমর রা: খ্রিষ্টান গোত্র বনু তাগলিবের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের জিজিয়া কর মওকুফ করেন এবং অন্য আরেক ধরনের করারোপ করেন। উল্লেখ্য, সে সময়গুলোতে আজকের মতো আধুনিক কর পদ্ধতির প্রচলন ছিল না। ড. কারদাভী আরো বলেন, বর্তমান সময়ের বাস্তবতা হলো, অমুসলিমরা আর জিজিয়া কর প্রদান করতে চায় না। কোনো মুসলিম রাষ্ট্রও এ ধরনের করারোপ করতে আগ্রহী নয়। তাই তারা জাকাতের মতোই আরেকটি কর প্রদান করতে পারে। নতুন সেই করটির নাম যে জিজিয়াই হতে হবে- এমন কোনো কথা নেই।

হজরত উমর রা: বনু তাগলিবের ওপর থেকে জিজিয়া কর মওকুফ করে দিতে চেয়েছিলেন। হজরত নুমান ইবনে জুরা রা: বলেন, ‘বনু তাগলিব হলো একটি আরব গোত্র- যারা জিজিয়া দিতে চাইত না।’ তারপর হজরত উমর রা: বিকল্প আরেকটি করারোপ করলেন। এ প্রসঙ্গে ইমাম আবু ওবায়েদ লেখেন, ‘হজরত উমর রা: বনু তাগলিবের কাছ থেকে ঠিকই কর আদায় করতেন, তবে জিজিয়া নামে নয়; বরং সেই করটির তিনি নামকরণ করেছিলেন সিসতানিত সাদাকাহ। হজরত উমর রা:-এর এই ধরনের বিচক্ষণতার কারণে বলা হয় যে, উমর রা:-এর মুখে যেমন সত্য ছিল, তেমনি তার অন্তরও ছিল সততায় পরিপূর্ণ। ইমাম আবু ওবায়েদ হজরত উমরের এই সিদ্ধান্তকে সর্বোত্তম একটি সিদ্ধান্ত হিসেবে (কিতাবুল আমওয়াল) স্বীকৃতি দিয়েছেন।

এক আলোচনায় ড. মানজের কাহফ বলেন, বর্তমান রাষ্ট্রকাঠামোর সাথে জিজিয়ার ধারণা সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কেননা এখন আর দেশকে বা কোনো ভূখণ্ডকে জয় করার ঐতিহ্য কার্যকর নেই। আর প্রতিটি দেশই স্বাধীন হয়েছে বা পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মুসলিম ও অমুসলিম সব নাগরিকের সম্মিলিত চেষ্টার ভিত্তিতেই। সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ: একইভাবে তার রাসায়েল ও মাসায়েল গ্রন্থে অমুসলিমদের অধিকার সংক্রান্তে একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে বলেছেন, জিজিয়া কেবল দখলকৃত ভূখণ্ডের নাগরিকদের জন্যই প্রযোজ্য। তবে পাকিস্তান বা বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে অমুসলিম নাগরিকদের জন্য জিজিয়া প্রযোজ্য নয়।

উপসংহার : বেশ কিছু ফকিহ মতামত দিয়েছেন, জাকাতের অর্থ অমুসলিমদের পেছনে খরচ করা যায়। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠদের মত হলো- অমুসলিমদের দারিদ্র্য বিমোচন করার জন্য জাকাত নয়, বরং জাকাতবহির্ভূত খাত থেকে আসা অর্থ ব্যয় করাই শ্রেয়। এ বিষয়ে কেনো দ্বিমত নেই যে, যেকোনো ইসলামিক রাষ্ট্রের জন্যই দারিদ্র্য বিমোচন এবং অমুসলিমদের কল্যাণ সাধন করা অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব।

আমার মতে, মধ্যম সারির উন্নত দেশগুলোর জন্য জাকাতের অর্থ দিয়েই অবশিষ্ট দরিদ্র ও বেকার জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন করা সম্ভব। তবে যেসব দেশে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা অনেক বেশি সেখানে শুধু জাকাতের অর্থ এ জন্য যথেষ্ট না-ও হতে পারে। এসব দেশের ক্ষেত্রে দারিদ্র্যবিমোচন কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য জাকাতের পাশাপাশি আরো বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। যেসব পণ্যের ওপর জাকাত দিতে হবে, জাকাত প্রদানের নিসাব (যে মূল্য বা পরিমাণের কম হলে জাকাত হয় না) এবং জাকাতের হার নিম্নে প্রদান করা হলো।

১. যেসব সম্পদের ওপর জাকাত ধার্য হয় : নগদ টাকা বা ব্যাংকে টাকা থাকলে, শেয়ার সার্টিফিকেট, বন্ড থাকলে, ইন্স্যুরেন্সে সারেন্ডার করার পর টাকা পেলে, চূড়ান্ত নিষ্পত্তির পর টাকা পেলে কিংবা প্রোভিডেন্ট ফান্ড থেকে এক বছরের মধ্যে অফেরতযোগ্য টাকা তুলে নিলে। জাকাত প্রদানের জন্য প্রয়োজনীয় নিসাব : এই আইটেমের নিসাব ৫২.৫ তোলা রুপার মূল্য।
যে হারে জাকাত দিতে হবে : মূল পরিমাণের ২.৫ শতাংশ। শেয়ারের ক্ষেত্রে বাজারমূল্যের বা বুক মূল্যের ২.৫ শতাংশ (জাকাতদাতার ইচ্ছা অনুযায়ী)।
২. স্বর্ণ, রৌপ্য, দামি কোনো বস্তু, স্বর্ণ বা রুপার অলঙ্কার।
জাকাত প্রদানের জন্য প্রয়োজনীয় নিসাব : স্বর্ণের ক্ষেত্রে ৭.৫ তোলা, রুপার ক্ষেত্রে ৫২.৫ তোলা আর স্বর্ণ ও রৌপ্যের মিশ্রণের ক্ষেত্রে ৫২.৫ তোলা রুপার দাম। যে হারে জাকাত দিতে হবে : বাজারমূল্যের ২.৫ শতাংশ।

৩. শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের স্টক
জাকাত প্রদানের জন্য প্রয়োজনীয় নিসাব : ৫২.৫ তোলা রুপার দাম। যে হারে জাকাত দিতে হবে : (জাকাত বছরের শেষ দিনে মালের স্টকের মূল্যের ২.৫ শতাংশ)।
৪. শস্য উৎপাদনকারী জাকাত প্রদানের জন্য প্রয়োজনীয় নিসাব : ৫ ওয়াসাক বা ৯৪৮ কিলোগ্রাম। যে হারে জাকাত দিতে হবে : অসেচযোগ্য জমিতে উৎপাদিত পণ্যের ১০ শতাংশ এবং সেচ করা জমিতে উৎপাদনের ৫ শতাংশ অথবা সে পরিমাণ মূল্য।
৫. প্রাণী : (অ) ভেড়া বা ছাগলের ক্ষেত্রে : জাকাত প্রদানের জন্য প্রয়োজনীয় নিসাব : ৪০ (চল্লিশটি)
যে হারে জাকাত দিতে হবে : (ক) ১-৩৯টি প্রাণীর জন্য জাকাতের পরিমাণ শূন্য। (খ) ৪০-১২০টি প্রাণীর মালিকের জন্য জাকাতের পরিমাণ হচ্ছে একটি। (গ) ১২১-২০০ প্রাণীর মালিকের জন্য পরিমাণ দু’টি। (ঘ) ২০১-৩০০ প্রাণীর মালিকের জন্য পরিমাণ তিনটি। (ঙ) প্রতিটি পূর্ণ অথবা এর অতিরিক্ত প্রতি শত সংখ্যক প্রাণীর মালিকের জন্য প্রতি শতকে একটি করে প্রাণী যোগ্য হবে। (চ) গরু, ষাঁড় বা অন্য কোনো গবাদিপশুর ক্ষেত্রে : জাকাত প্রদানের জন্য প্রয়োজনীয় নিসাব ৩০ (ত্রিশটি)। যে হারে জাকাত দিতে হবে :
(ক) ১-২৯টি প্রাণীর জন্য জাকাতের পরিমাণ : শূন্য। (খ) ৩০-৩৯টি প্রাণীর মালিকের জন্য জাকাতের পরিমাণ হচ্ছে এক বছরের একটি বাছুর। (গ) ৪০-৫৯টি প্রাণীর মালিকের জন্য জাকাতের পরিমাণ দুই বছরের একটি বাছুর। (ঘ) ৬০ বা তার অধিক সংখ্যক প্রাণীর মালিকের জন্য জাকাতের পরিমাণ হচ্ছে প্রতি ৩০টি প্রাণীর জন্য একটি করে এক বছরের বাছুর যোগ্য হবে।

৬. খনিজ পণ্য উৎপাদন জাকাত প্রদানের জন্য কোনো নিসাব নেই। যে হারে জাকাত দিতে হবে : যে পরিমাণ খনিজ পণ্য তোলা হবে তার বাজারমূল্যের ২০ শতাংশ। ৭. সমুদ্র এবং নদী থেকে সংগৃহীত মাছ :
জাকাত প্রদানের জন্য এর কোনো নিসাব নেই। যে হারে জাকাত দিতে হবে : কারো কারো মতে, খনিজ সম্পদের সাথে তুলনা করে ২০ শতাংশ দিতে হবে। অন্য মতে, ফসলের জাকাতের সাথে তুলনা করে ১০ শতাংশ মূল্য দিতে হবে।
৮ অন্যান্য পণ্য : জাকাত প্রদানের জন্য প্রয়োজনীয় নিসাব শরিয়াহ অনুসারে। যে হারে জাকাত দিতে হবে : শরিয়াহ অনুসারে।
লেখক : সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার