যুক্তরাষ্ট্র-চীন লড়াইয়ে বিপাকে পাকিস্তান!

Nov 27, 2019 07:51 am
যুক্তরাষ্ট্র-চীন লড়াইয়ে বিপাকে পাকিস্তান!

 

গত সপ্তাহে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা চীন পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরকে (সিপিইসি) লাইমলাইটে রাখে। প্রথমটি কছিল সিপিইসি নিয়ে মার্কিন কর্মকর্তা অ্যালিস ওয়ালেসের বিরূপ মন্তব্য এবং দ্বিতীয়টি ছিল লে. জেনারেল (অব.) অসিম বাজওয়াকে সদ্য গঠিত সিপিইসি কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্তি।

দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক শীর্ষ মার্কিন কূটনীতিক অ্যালিস ওয়ালেস সিপিইসির সমালোচনা করে বলেন যে এটি পাকিস্তানের জন্য ঋণের বোঝা সৃষ্টি করছে। তার মতে, এই প্রকল্প চীনা রাষ্ট্রায়াত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য মুনাফা বয়ে আনছে। তিনি সুনির্দিষ্টভাবে বিপুল ব্যয়ে পরিকল্পিত এমএল-১-এর আধুনিকায়নের কথা উল্লেখ করে ওই প্রকল্পে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে জানান। তিনি আরো দাবি করেন, চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে বিনিয়োগের মডেলের বিকল্প হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের এফডিআই অনেক ভালো।

চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) প্রতি ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক আগ্রাসী অবস্থান এবং চীনা সহজতর মূলধন থেকে বিশ্বকে দূরে রাখার প্রয়াস জোরদার করার অংশ হিসেবেই ওয়ালেসের এই বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে। গত মাসে মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী উইলবার রস চীনা এসওইগুলোর অযৌক্তিক মুনাফার কথা উল্লেখ করেছেন। আবার মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স শ্রীলঙ্কা থেকে পাকিস্তান থেকে গ্রিস পর্যন্ত বন্দরগুলোতে চীনা মালিকানার পতাকা উড্ডয়ন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। পেন্স গত সেপ্টেম্বরে সফরকালে প্রকাশ্যেই আইসল্যান্ডের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন দেশটি চীনের বিআরআই বিনিয়োগ প্রত্যাখ্যানের জন্য।

যুক্তরাষ্ট্রের এই কঠোর অবস্থান এসেছে ওয়াশিংটন-বেইজিং বাণিজ্যযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এবং পরাশক্তি দুটির মধ্যে টানাপোড়েনের ফলে। চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক কোন দিকে যাবে সে ব্যাপারে এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে অনেকে দাবি করছেন, এই মেরুকরণের ফলে আসলে বিআরআইয়ের যৌক্তিকতাই ফুটে ওঠছে। বেন স্টেইল ও বেনিয়ামিন ডেলা রোকা এক ব্লগ পোস্টে বলেছেন, ট্রাম্পের শুল্কের ফলে অনেক দেশের জন্যই চীনের সাথে উদ্বৃত্ত বাণিজ্য ভারসাম্য সৃষ্টি করেছে। আর আফ্রিকা ও ল্যাতিন আমেরিকার বিআরআই অংশীদারেরা সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র-চীন বিরোধে পাকিস্তান লাভবান হচ্ছে খুবই কম। দেশটি নিজের সমস্যাতেই নিমজ্জিত রয়েছে। ইমরান খান ক্ষমতায় আসার পর সিপিইসি দায় পরিশোধের সঙ্কটে পড়ে। অর্থ সঙ্কটের কারণে সিপিইসিতে নতুন বিনিয়োগ আসছে না, আবার পুরনোগুলোতে অগ্রগতি মন্থর হয়ে পড়েছে।

তবে সিপিইসি কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা ও ৯ জেসিসি সভায় নতুন করে সংলাপের ফলে সিপিইসির সম্ভাবনা আবার উজ্জ্বল হয়েছে। অনেকে মনে করছেন, সাবেক এক জেনারেলের সিপিইসির দায়িত্ব পাওয়ার ফলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর হয়ে এটি আবার চাঙ্গা হবে।

জেসিসির সভায় দুই পক্ষ এমএল-১ প্রশ্নে প্রাথমিক পরিকল্পনা প্রণয়ন জোরদার করার ব্যাপারে একমত হয়। আবার আইএমএফের বাধ্যবাধকতার কারণে চীন একটি উচ্চ পর্যায়ের অর্থনৈতিক কমিটি গঠনের ব্যাপারেও একমত হয়।

এসবের মধ্যেও সিপিইসির নিয়ে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে ক্রমবর্ধমান মেরুকরণ পাকিস্তানের জন্য বড় ধরনের সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। পাকিস্তান ইতোমধ্যেই আইএমএফের বাধ্যবাধকতা পূরণ করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। আবার আইএমএফ ও এফএটিএফে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব আছে অনেক। ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে ঘাটানো পাকিস্তানের জন্য মুসকিল। অন্যদিকে চীন হলো পাকিস্তানের পরীক্ষিত বন্ধু। এই দেশের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার সহায়তার কারণেই জ্বালানি সঙ্কটসহ নানা সমস্যা থেকে বের হওয়ার চেষ্টা চালাতে পারছে পাকিস্তান।

দুটি বিকল্পের একটিকে বেছে নেয়ার মতো অবস্থায় নেই পাকিস্তান। তাকে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের সাথেই সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। আর এজন্য করতে হবে ভারসাম্যমূলক কাজ। আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো, সিপিইসির ভবিষ্যত প্রকল্পগুলোর জন্য পাকিস্তানকে আরো সুবিধাজনক শর্ত আদায় করে নিতে হবে। নয়তো পাকিস্তান সরকারকে খুব শিগগিরই কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তে হতে পারে।

দি এক্সপ্রেস ট্রিবিউন