চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও বিশ্বব্যবস্থা

Jan 09, 2020 05:53 pm
চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও বিশ্বব্যবস্থা

 

একুশ শতকের আমাদের এই পৃথিবীকে বলা হচ্ছে, বৈশ্বিক গ্রাম বা গ্লোবাল ভিলেজ। প্রযুক্তির অকল্পনীয় উৎকর্ষের ফলে এখন আর ‘দূরের’ বলতে কিছু নেই। পুরো দুনিয়া হয়ে গেছে একই গ্রামের মতো। সাত সাগরের ব্যবধান ঘুচিয়ে দিয়ে সাত মহাদেশের মানুষকে করে দিয়েছে পরস্পরের প্রতিবেশী। তথ্য আদান-প্রদানের তাৎক্ষণিক ও অভূতপূর্ব সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, যা এক সময়ে মানুষ চিন্তাও করতে পারেনি। এই প্রেক্ষাপটে আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে ‘চতুর্থ শিল্পবিপ্লব’। বিষয়টি নিয়ে দেশে দেশে আলোচনা হচ্ছে; আয়োজন করা হচ্ছে সেমিনার-সিম্পোজিয়াম। কিভাবে এই বিপ্লবের সাথে নিজেদেরকে খাপ খাওয়াতে হবে, কোন কোন ক্ষেত্রে কী প্রস্তুতি নিতে হবে- তার চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে দেশে দেশে। প্রযুক্তির এ বিপ্লব সংঘটিত হবেই এবং তা শুরু হয়ে গেছে। এখন কে কতটা প্রস্তুতি নিতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট দেশ ও জাতির সফলতা-ব্যর্থতা। যারা যত বেশি যোগ্যতার সাথে এ বিপ্লবকে ধারণ করতে পারবে, তারা তত এগিয়ে থাকবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী ১০ বছরের মধ্যেই ব্যাপক পরিবর্তন আসবে ডিজিটাল এ বিপ্লবের মাধ্যমে বিশ্বের প্রতিটি দেশের প্রতিটি খাতে। ইতোমধ্যে এ পরিবর্তন দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে দেশে দেশে। এর ফলে পাল্টে যাচ্ছে উৎপাদন প্রক্রিয়া, ব্যবস্থাপনা, এমনকি রাষ্ট্র পরিচালনার প্রক্রিয়াও। মানুষের জীবনমানে আসছে নানা পরিবর্তন। ‘জীবন হবে আরো মসৃণ ও আরামদায়ক, নীরোগ ও সুখময়’- কেউ কেউ বলছেন। আশাবাদী এ মহলের কেউ কেউ এত দূর পর্যন্ত বলতে চাচ্ছেন যে, মানুষ হয়তো অমরত্ব লাভ করবে না; তবে অমরত্বের কাছাকাছি পৌঁছে যাবে এ ডিজিটাল বিপ্লবের মাধ্যমে।

মূলত ‘তৃতীয় শিল্পবিপ্লব’ বলা হয় ১৯৬৯-এ ইন্টারনেট আবিষ্কারকে। এটারই বর্ধিত ও উন্নত সংস্করণ হচ্ছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব। সহজভাবে বলা যায়, আপনার হাতে কাপ আছে- চা খাবেন। আপনার মেশিনই প্রয়োজনমতো চা, চিনি, দুধ ইত্যাদি মিশিয়ে চা তৈরি করে দেবে। আপনি শুধু আসনে বসে পান করবেন। উপাদানগুলো আপনাকে মেশাতে হবে না। তেমনি বলা হচ্ছে- ইন্টারনেট অব থিংস (Internet of things) অর্থাৎ আপনার বাসার ইলেকট্রনিক ডিভাইসগুলো পরস্পরের সাথে সংযুক্ত থাকবে এবং আপনার হাতের স্মার্টফোন দিয়ে সব তথ্যই আপনি অবগত হচ্ছেন। বাজার কী লাগবে এটা নিয়ে আপনার ভাবতে হবে না; আপনার ফ্রিজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে দোকানিকে বলে দেবে- কী কী লাগবে।

দোকান থেকে ফ্রিজের পাঠানো লিস্ট অনুযায়ী মালামাল সরবরাহ করবে; আপনার ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ডের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পেমেন্ট হয়ে যাবে। এমনিভাবে আপনি এয়ারপোর্ট থেকে বাসায় ফেরার পথে আপনার স্মার্টফোন দিয়ে বাসায় পৌঁছার আগেই আপনার এসি বা রুমহিটার চালু করতে পারবেন, যাতে করে বাসায় পৌঁছেই আপনি আপনার রুমটি আরামদায়ক শীতল বা উষ্ণ পেয়ে যান। মানবদেহে অসুখ-বিসুখ হলে তা আরো নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করা যাবে এবং অস্ত্রোপচারের ঝুঁকি এড়িয়ে বেদনাহীনভাবেই রোবোটিকস পদ্ধতিতে তার চিকিৎসা হবে। এমনকি দেহের ‘জিন’ পরিবর্তন করে মানুষকে সুস্থ ও দীর্ঘজীবী করা সম্ভব হবে। এক কথায় জীবনটা সুখ আর শান্তিতে ভরে যাবে; আশাবাদী মহল এমনভাবেই বিষয়টিকে তুলে ধরতে চাইছেন। বলা হচ্ছে, গোটা পৃথিবী শান্তি, সমৃদ্ধি ও সুখের বাগানে পরিণত করবেন তারা ডিজিটাল এ বিপ্লবের মাধ্যমে।

বিশেষজ্ঞ পণ্ডিতরা এ বিষয়ে আরো ব্যাপক আলোচনা করবেন, এর সম্ভাব্যতা নিয়ে আশার বাণী শোনাবেন, এর প্রভাব প্রতিক্রিয়া নিয়ে গবেষণা করবেন। আমরাও তাদের সাথে আশাবাদী হতে চাই। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা ও বিশ্ব নেতৃত্বের অধীনে এই আশাবাদের বাস্তবতা কতটুকু? পৃথিবীর প্রায় ৭০০ কোটি বনি আদম কতটুকু উপকৃত হবে; অতীতের আলোকে আমরা একটু পর্যালোচনা করতে চাই। প্রযুক্তির এই আশীর্বাদে সবাইকে সিক্ত করতে চাইলে কোন খাতটিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, আমরা সেদিকটাই একটু ভেবে দেখতে চাই।

অতীতের সবগুলো শিল্পবিপ্লব এক অপার সম্ভাবনা নিয়েই সংঘটিত হয়েছিল। উৎপাদন, বিপণন ও ভোগসহ প্রায় প্রতিটি খাতেই এসেছে অভাবনীয় পরিবর্তন। দৃষ্টান্ত হিসেবে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে সংঘটিত প্রথম শিল্পবিপ্লবের কথা বলা যায়। বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কারের মাধ্যমে সূচিত এই বিপ্লব উৎপাদন ও বিপণনে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনে দিয়েছিল। এর প্রায় ১০০ বছরের মাথায় বিদ্যুৎ আবিষ্কারের মাধ্যমে পৃথিবী আরেক ধাপ এগিয়ে গেল। আকাশের বিদ্যুৎ ধরে এনে কাজে লাগিয়ে মানুষ অসাধ্য সাধন করতে সক্ষম হলো। এটাকে দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লব বলা হয়। তৃতীয় শিল্পবিপ্লব আখ্যায়িত করা হয় ১৯৬৯ সালের ইন্টারনেট আবিষ্কারকে যেটিও দ্বিতীয় বিপ্লবের প্রায় এক শতাব্দী পরে সংঘটিত হয়েছিল। উৎপাদন, বিপণন, ভোগ-ব্যবহার,পরিবহন, যোগাযোগ, শিক্ষা-সংস্কৃতি সব ক্ষেত্রেই বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। বলতেই হয়, সভ্যতা এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। সামন্ত যুগের তুলনায় উৎপাদন বেড়েছে বহুগুণ। প্রাচুর্যের জোয়ার এসেছিল।

কিন্তু ভারসাম্যপূর্ণ বণ্টনের অভাবে; অন্যভাবে বলতে গেলে মুষ্টিমেয় কিছু লোভী মানুষ যারা সমাজ ও রাষ্ট্রের স্টিয়ারিং হুইলটি কব্জা করে নিয়েছে, তাদের লোভের কারণে শিল্পবিপ্লবের সুফল থেকে বঞ্চিত হলো বিশ্বের বেশির ভাগ মানুষ। বস্তুবাদ ও ভোগবাদ কথিত সেকুলারিজমের নামে ধর্ম ও নৈতিকতাকে জীবন থেকে নির্বাসিত করে দিলো, অর্থাৎ সমাজ-রাষ্ট্র, অর্থনীতি, উৎপাদন, বণ্টন ইত্যাদি কোনো ক্ষেত্রেই ধর্ম বা নৈতিকতার কোনো ভূমিকা থাকবে না। রাষ্ট্রযন্ত্র হবে মূল্যবোধ নিরপেক্ষ। এই নীতির ফলে সম্পদের উৎপাদনসহ ভোগের হাজারো রাস্তা খুলে গেলেও সম্পদ ক্রমান্বয়ে মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে কুক্ষিগত হয়ে গেল, বৃহত্তর জনগোষ্ঠী চরমভাবে বঞ্চিত হয়ে অভাবে অনাহারে ধুঁকতে থাকে। সম্পদ কুক্ষিগত করার এই ঘৃণ্য প্রতিযোগিতা এবং নৈতিকতাহীন নেতৃত্বের কারণে শিল্পবিপ্লবোত্তর পৃথিবী পেয়েছে দু-দুটো বিশ্বযুদ্ধ, পারমাণবিক মারণাস্ত্র, ১৯৩০ ও ১৯৩৯-এর মহামন্দা ইত্যাদি।

একুশ শতকের পৃথিবীতে কি কোনো গুণগত পরিবর্তন এসেছে? চতুর্থ শিল্পবিপ্লব নিঃসন্দেহে অপার সম্ভাবনার দরজা খুলে দেবে; কিন্তু একটি বিশেষ সুবিধাভোগী গোষ্ঠী ছাড়া বৃহত্তর মানবজাতি কি এর সুফল পাবে? একুশ শতকের এই আলো ঝলমল পৃথিবীর প্রকৃত রূপ কেমন, আমরা একটু দেখার চেষ্টা করি। বর্তমান সভ্যতাকে বলা হয় ৮০:২০ শতাংশের সভ্যতা। অর্থাৎ পৃথিবীর ৮০ শতাংশ সম্পদের মালিক হচ্ছে মাত্র ২০ শতাংশ মানুষ; আর বাকি ৮০ শতাংশ মানুষের হাতে রয়েছে মাত্র ২০ শতাংশ সম্পদের মালিকানা। ২০১৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস এক নিবন্ধে অক্সফামের উদ্ধৃতি দিয়ে এ বিষয়ে আরো তথ্য দিয়েছেন। অক্সফামের ২০১৬ সালের পূর্বাভাস ছিল, পৃথিবীর ৯৯ শতাংশ মানুষের কাছে মাত্র ১ শতাংশ সম্পদ থাকবে এবং অবশিষ্ট ১ শতাংশ মানুষের হাতে কুক্ষিগত হবে ৯৯ শতাংশ সম্পদ। এমন একটি বৈষম্যমূলক দুনিয়ায় চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সুবিধা এই ৯৯ শতাংশ মানুষ কি আদৌ পাবে? ২০১৯ সালে পৃথিবীর আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থার কোনো উন্নতি কি আমাদের নজরে এসেছে?

আজ যারা বিশ্বকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারা যতই গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের কথা বলে চিৎকার করছেন, সেমিনার-সিম্পোজিয়াম অথবা জাতিসঙ্ঘের সাধারণ অধিবেশনে কথার ফুলঝুরি ছড়িয়ে দিচ্ছেন, তাদের নেতৃত্বে বিশ্ব বাসের অযোগ্য একটি গ্রহে পরিণত হচ্ছে, যা বড়ই অশনিসঙ্কেত! সাম্য ও সুবিচার তথা জাস্টিস অ্যান্ড ইকুয়িটি বলে যারা গলাবাজি করছেন, তারাই জুলুম ও গোষ্ঠীতন্ত্রের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন পৃথিবীকে। এক দিকে পশ্চিমা বিশ্ব গণতন্ত্রের ধুয়া তুলছে, অন্য দিকে তৃতীয় বিশ্বে স্বৈরশাসকদের মদদ দিচ্ছে নিজেদের ঘৃণ্য স্বার্থ বজায় রাখতে, যার বলি হচ্ছে কোটি কোটি নিরীহ বনি আদম।

দেশে দেশে আজ ধর্ম ও বর্ণের ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা হচ্ছে চতুরতার সাথে। জীবন বাঁচানোর তাগিদে লাখ লাখ মানুষ নিজেদের বাস্তুভিটা ত্যাগ করে অজানার পথে পাড়ি জমাচ্ছে, আর ভূমধ্যসাগর কিংবা নাফ নদীর তীরে অসংখ্য আয়লানের লাশ মুখ থুবড়ে পড়ে থাকছে; বিশ্ব মোড়লরা এসব জালিম শাসককে পৃষ্ঠপোষকতা করছে শুধু সম্পদ ও ক্ষমতা কুক্ষিগত ও বৃদ্ধি করার জন্য।
বর্তমান পুঁজিবাদী ও বস্তুবাদী সভ্যতার লালন ক্ষেত্র হচ্ছে পশ্চিমা দেশগুলো। মোড়লের ভূমিকায় রয়েছে ‘পঞ্চপাণ্ডব’ আমেরিকা, ব্রিটেন, ফ্রান্স, চীন ও রাশিয়া। এদের মধ্যে আমেরিকা, ব্রিটেন ও ফ্রান্স হচ্ছে উদার গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ইত্যাদির প্রবক্তা। কিন্তু এসব আদর্শ বাস্তবায়নে তাদের দ্বিমুখী আচরণ দেখে বোঝা যায়, নিজেদের স্বার্থের বাইরে এগুলো তাদের ফাঁকা বুলি ছাড়া কিছুই নয়। এ দেশগুলোও বর্ণবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে উঠতে পারেনি। এমন অসংখ্য দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে রয়েছে।

বরং এ দেশগুলো ক্রমান্বয়ে বর্ণবাদ, সঙ্কীর্ণ জাতীয়তাবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার দিকেই ধাবিত হচ্ছে এবং তাদের নেতৃত্বে গোটা বিশ্বই এক ধরনের অসহিষ্ণুতার দিকে ঝুঁকে পড়ছে, যেটি বিশ্বের শান্তি, সমৃদ্ধি ও স্থায়িত্বের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে। গত বছরের গোড়ার দিকে উদার গণতন্ত্রের দেশ ব্রিটেনের একটি ঘটনা বর্ণবাদী আচরণেরই বহিঃপ্রকাশ বলে চিন্তাশীল ব্যক্তিরা মনে করেন। বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত একজন ব্রিটিশ নাগরিক শামীমা বেগম তথাকথিত আইসিস বা ইসলামিক স্টেটে যোগদান করেছিলেন অনলাইন চক্রের ফাঁদে পড়ে। চার বছর পর অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় তাকে নিজ দেশে ফিরিয়ে নেয়ার আবেদন করলে ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তার আবেদন শুধু বাতিল করেই ক্ষান্ত হয়নি, তার নাগরিকত্ব খারিজ করে দিয়েছে; যা স্পষ্টতই মানবাধিকারের লঙ্ঘন।

এ প্রসঙ্গে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি অনুষদের শিক্ষক প্রিয়ংবদা গোপাল আলজাজিরায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলেছেন, ‘অন্তঃসত্ত্বা হয়ে একেবারে প্রসব অবস্থার কাছাকাছি এসে সেই দেশটির কাছে তাকে ফিরিয়ে নেয়ার আবেদন করেছে, যে দেশটিকে আইনগত দিক দিয়ে সে ‘নিজের দেশ’ বলে দাবি করতে পারে। তবে তার ‘নিজের দেশ’ তার আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে এবং তার ব্রিটিশ নাগরিকত্ব বাতিল করার ঘোষণা দিয়েছে। অনেকেই বলছেন, ‘মেয়েটি যদি শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ হতো তাহলে হয়তো যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাজিদ জাভিদের পক্ষে তার আবেদন নাকচ করা এত সহজ হতো না।’ এ পদক্ষেপ ব্রিটিশ ভোটাররা খুব ভালোভাবেই নিয়েছেন।

যেসব ব্রিটিশ নাগরিক নিজেদের উদার ও সহিষ্ণু বলে দাবি করেন, তারাও এই দলে আছেন। এর মধ্য দিয়ে যে বার্তাটি বিশ্ববাসীর কাছে স্পষ্ট সেটি হলো, আপনি যদি শ্বেতাঙ্গ না হন এবং আপনার বংশ পরিচয় যদি এশিয়ান বা আফ্রিকান দেশগুলোর সাথে সম্পৃক্ত থাকে; তাহলে ন্যায্য বিচার থেকে বঞ্চিত হবেন এবং এসব জায়গা থেকে আপনাকে ‘চলে যান’ বলে বের করে দেয়া হবে। ব্রিটেনে জন্ম নেয়া একজন নারীর নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়ার চেষ্টার মধ্য দিয়ে ব্রিটেনে বসবাসকারী বহু লোকের ধারণা হবে, যারা শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ নন, তারা আসলে ব্রিটিশ নাগরিক হতে পারবেন না। এ বিষয়ে সবচেয়ে রাখঢাকহীন মন্তব্য করেছেন ব্রিটিশ লেখক এলিসন পিয়ারসন। তিনি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় লিখেছেন, ‘শামীমা বেগমের জন্ম হয়তো এখানে। কখনোই তিনি ব্রিটিশ নন।’

তার মানে আপনার বাপ-দাদা যদি এশিয়ান, ক্যারিবিয়ান কিংবা আফ্রিকান হয়ে থাকেন; তাহলে আপনি কখনোই ‘পাক্বা ব্রিটিশ’ হিসেবে নিজেকে মনে করতে পারবেন না, আপনি যেখানেই জন্ম নিন বা আপনার বাপ-দাদা যত দিনই ব্রিটেনে বসবাস করে থাকুন। আমরা জেনেছি ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান বংশোদ্ভূত শত শত ব্রিটিশ নাগরিককে শুধু কালো হওয়ার কারণে ক্যারিবিয়ান দেশগুলোতে ফেরত পাঠানো হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। অথচ যাদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে তাদের মধ্যে এমন অনেকেই আছেন যারা কখনই সেসব দেশে ছিলেন না। ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই পদক্ষেপে অভিবাসী সম্প্রদায় মনে করতে বাধ্য হচ্ছে, শুধু বর্ণ পরিচয়ের কারণে তারা কখনোই পুরোপুরি ব্রিটিশ নাগরিক হয়ে উঠতে পারবে না। নিবন্ধটির উপসংহার টেনেছেন তিনি এভাবে, ‘তার বিষয়ে যা হবে, তা আদালতের রায়ের মাধ্যমে হতে হবে। তিনি যদি দোষী ও অপরাধী হন, তাহলে অন্য ব্রিটিশ নাগরিকদের মতো তাকেও বিচারের আওতায় এনে সাজা দেয়া হোক। কিন্তু তা না করে জনতুষ্টিবাদী চেতনা দিয়ে তার নাগরিকত্ব বাতিল করা হলে আবার প্রমাণিত হবে, ব্রিটিশরা ঔপনিবেশিক আমলের সেই বর্ণবাদী আচরণ থেকে আজো বেরিয়ে আসতে পারেনি।’ নিবন্ধটির বাংলা অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে দৈনিক প্রথম আলোতে ৪ মার্চ ২০১৯। উদ্ধৃতির ঘটনাটি পৃথিবীর সবচেয়ে উদার গণতান্ত্রিক দাবিদার দেশটিতে ঘটেছে।

গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের বিষয়ে উচ্চকণ্ঠ এ দেশগুলো আমেরিকার নেতৃত্বে মধ্যপ্রাচ্যে আরব দেশগুলোর স্বৈরশাসকদের নির্লজ্জ সহযোগিতা করছে তাতে তাদের ভণ্ডামি গোটা বিশ্বের কাছে একেবারেই পরিষ্কার। মিসরের একমাত্র নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে উৎখাতকারী সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল সিসিকে পশ্চিমা বিশ্বের সমর্থন এর জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত।